নগরজুড়ে মরণফাঁদ

সিলেট নগরের জিন্দাবাজার-জল্লারপাড় সড়ক। সড়কের পাশের ড্রেন সংস্কারের কাজ চলছে। প্রায় এক সপ্তাহ আগে খুড়ে রাখা হয়েছে এই ড্রেন। এক সপ্তাহ ধরেই এটি রয়েছে উন্মুক্ত অবস্থায়। খুঁড়ে রাখা নালায় জমেছে ময়লা পানি। সংস্কারকাজে ব্যবহৃত আঁকাবাঁকা রড বেরিয়ে আছে বিপজ্জনকভাবে। আর খুঁড়ে নালার কাদামাটি স্তুপ করে রাখা হয়েছে স[কের পাশে।

খুঁড়ে রাখার পর থেকে এই নালায় প্রতিদিনই ঘটছে একাধিক দুর্ঘটনা। অসতর্ক অবস্থায় উন্মুক্ত নালায় পড়ে যাচ্ছেন পথচারীদের কেউ কেউ। রাতের অন্ধকারে এমন দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।

কেবল এই একটি সড়কই নন, সিলেট নগড়জুড়েই ড্রেন সংস্কারের কাজ চলছে। সংস্কারকৃত ও সংস্কার কাজ চলা এসব ড্রেনের বেশিরভাগই ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্তভাবে। নেই কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কাজ চলা এলাকায় নেই সতর্কবার্তাও। ফলে অসতর্কভাবে পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছেন অনেকে।

গত ৭ ডিসেম্বর নগরের আম্বরখানা এলাকায় নির্মাণাধীন এরকম একটি ড্রেনে পড়ে যান প্রবীণ শিক্ষক ও ছড়াকার আবদুল বাসিত মোহাম্মদ। এসময় ড্রেনে বেরিয়ে থাকা রড তাঁর পেটে রড ঢুকে যায়। এরপর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার (১০ ডিসেম্বর) তিনি মারা যান।

আব্দুল বাসিতের মৃত্যুকে হতা দাবি করে ‘সংক্ষুব্দ নাগরিক আন্দোলন, সিলেট’-এর সমন্বয়ক আব্দুল করিম কিম বলেন, এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনরা নয়। এটি হত্যাকান্ড। সিটি করপোরেশনের অপরিকল্পিত ও দায়সারা উন্নয়ন কাজের বলি হয়েছেন আবদুল বাসিত। উন্নয়ন কাজের নামে অর্থের লুটপাট চলছে। ফলে নূন্যতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশনকে এই হত্যার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

সোমবার সিলেট নগর ঘুরে দেখা গেছে, নগরের জিন্দাবাজার,  চৌহাট্টা, বন্দরবাজার, আম্বরখানা, দরগাগেট, মজুমদারি, চৌকিদেখি, শিবগঞ্জ, মিরাবাজার, শাহী ঈদগাহ, কুমারপাড়া, নাইওরপুল, মদিনা মার্কেট, সুবিদ বাজারসহ অন্তত ২২টি এলাকায় ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার কাজ চলছে। কোনো জায়গায়ই নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে, নূন্যতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। দেওয়া নেই কোনো সতর্কবার্তা। ড্রেনের জন্য গর্তখুঁড়ে দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। এসব গর্তে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ফেলে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী।

নগরের শিবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হিতাংশু বাবু বলেন, একবছরের বেশি সময় ধরে দেখছি আমাদের এলাকায় ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মিত ড্রেন অনেক জায়গায় খোলা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। অনেক জায়গায় মাটি খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। প্রতিদিনই এসব খোলা নালা কেউ না কেউ পড়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, নগরজুড়ে ভাঙাগড়ার খেলা চলছে। উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা নেই। অপরিকল্পিতভাবে পুরো নগরের সব সড়ক একসাথে খুঁড়ে ফেলার কারণে কোনো কাজই শেষ হচ্ছে না। ধুলোয় ধুসর হয়ে আছে নগর। নালা খুঁড়ে উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। সড়ক জুড়ে নির্মানসামগ্রী ফেলে রাখা। এসবে নগরবাসী চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

আবদুল বাসিতের মৃত্যুর পর নগরের কয়েকটি এলাকায় নির্মাণাধীন ড্রেনের আশপাশে লাল কাপড় বেঁধে বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে।

সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, নগরে ৯৭০ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। এর মধ্যে ৬৭০ কিলোমিটার অংশ উন্মুক্ত। বর্তমানে ৮০ কিলোমিটার অংশের নির্মাণকাজ চলছে। এতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
মিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, আবদুল বাসিতের দুর্ঘটনার পর ঠিকাদারদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই মৃত্যুর ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আবদুল বাসিতের মৃত্যুর সাথে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে গত রোববার নগরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় একটি মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নিয়ে সিটি করপোরেশনের কাছে পরিকল্পিত উন্নয়নের দাবি জানিয়ে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আল আজাদ বলেন, ইচ্ছেমত খুঁড়াখুঁড়ি, লোকদেখানো উন্নয়ন কাজ বন্ধ করতে হবে। নতুবা সুফলের চাইতে দুর্ভোগই বেশি পোহাতে হবে নরগরবাসীকে।

নগরের বেশিরভাগ ড্রেন উন্মুক্ত থাকাকে সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, খোলা ড্রেনে পড়ে একজন প্রবীন ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য