কেন দণ্ডবিধির জনক লর্ড মেকলে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখলেন না?

সারা ভারতবর্ষ উত্তাল। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ভারতে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করা হলো। বছরের ব্যবধানে সমাজে বিধবা নারীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। স্বামী বা অভিভাবক শূন্যতার এই সুযোগে সমাজে একই তালে বেড়ে গিয়েছিল ধর্ষণ।

এমন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে প্রথম আইন কমিশনের দায়িত্ব নিয়ে ভারতবর্ষে এলেন লর্ড ব্যাবিংটন ম্যাকলে।

ভারতের জন্য দণ্ডবিধি সুপারিশ করার দায়িত্বও পেলেন তিনি। ভারতীয় সমাজ সংস্কারকগণ তাকে বুঝালেন, ধর্ষণ কেবল মৃত্যুদণ্ড দিয়েই রোধ করা সম্ভব।
অবশ্য, ম্যাকলে তাদের মতে গা ভাসালেন না, বরং সময় নিলেন।

শুরু হলো ম্যাকলিও গবেষণা। অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক সমীক্ষা ও অপরাধ তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন, এ দেশে দু’টি অপরাধ সংগঠন কালে ভিকটিম খুব অসহায় অবস্থায় থাকে।

প্রথমটি ধর্ষণ এবং দ্বিতীয়টি ডাকাতি। তিনি বললেন, যদি আমরা ডাকাতি ও ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেই, তবে তো এ দু’টি অপরাধের ভিকটিমকে কোনো অপরাধী বাঁচিয়ে রাখবে না।

ধর্ষণকারীকে চিহ্নিত ও বিচারের আওতায় আনা যতটা সহজ, অজ্ঞাত ব্যক্তির দ্ধারা ধর্ষণসহ খুনের অপরাধ বিচারিক আওতায় আনা ও প্রমাণ করা ততটাই কঠিন।
সবদিক বিবেচনায় নিয়ে ম্যকলে যাবজ্জীবনের সুপারিশই করলেন। এবংবিধ কারণে সেই সুপারিশ মোতাবেকই ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন রেখে প্রণীত হলো দণ্ডবিধি।
ম্যাকলের অপরাধী শনাক্তের তত্ত্ব এখন বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির দ্ধারা খণ্ডিত হয়েছে।

অপরাধের তদন্ত ও আসামি শনাক্তে কল্পনাতীত গতি দিয়েছে বিজ্ঞান। ডিএনএ টেস্ট, বায়োমেট্রিক ম্যাপিং সহ নানা পদ্ধতিতে অপরাধীকে এখন খুঁজে বের করা কষ্টসাধ্য, তবে দুঃসাধ্য নয়।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও কিছু ক্ষেত্রে প্রকটভাবে দৃশ্যমান। যেমন, একাবিংশ শতাব্দীর এই বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতার যুগে ভারতে আরুসি তালোয়ার হত্যা মামলায় পুলিশ ও সিআইডি স্বাভাবিক ও বিজ্ঞানের শত রাস্তা ধরেও মৃত্যুর আসল কারণ উন্মোচন করতে পারেনি।

বাবা-মার পাশাপাশি ঘরে থাকার পরও আরুসিকে হত্যা করা হলো। প্রথমে বাড়ীর কাজের লোককে পাওয়া যাচ্ছিল না। পুলিশ সন্দেহ করেছিল আরুসিকে ধর্ষণসহ হত্যা করে কাজের ছেলেটি পালিয়ে গেছে।

এমন অনুমান হতে শুরু হয় তদন্তে অবহেলা। কিন্তু পুলিশের সম্বিৎ ফেরে কাজের ছেলের লাশও একই বাড়ী থেকে দু’দিননের ব্যবধানে উদ্ধার হওয়ার পর।
এরই মধ্যে আরুসিকে হত্যার সব আলামত পুলিশের অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। যে ঘরে আরুসিকে হত্যা করা হলো, সে ঘর হতে ষাটের অধিক ডিএনএ সংগ্রহ করা হলো।
কারণ মারা যাবার পরে সবাই হুরমুরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছিল লাশ দেখার জন্য।অবশেষে; ১০ বছর শেষে সম্প্রতি আলামত নষ্ট হবার জন্য হতাশ হয়ে ভারতীয় হাইকোর্ট এই মামলায় তদন্ত বন্ধের আদেশ দিয়েছেন।

তবে; আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্ক্ষলা বাহিনী অনেক চৌকস। তারা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের পেশাদারিত্ব দেখাতে সচেষ্ট থাকেন। যদিও হাল সময়ের অপরাধ আমলে নেবার ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’ পুলিশের পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

তাই শতভাগ বিজ্ঞানসম্মত তদন্ত আদৌও সম্ভব কি-না তা ঘটনা সাপেক্ষ প্রশ্ন বটে। তবে গাফলতি বা অবহেলার সুযোগে অদম্য ও বেপরোয়া হতে পারে অপরাধীরা।

বর্তমানে ধর্ষণের অপরাধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করছেন। এ দাবি অমূলক নয়, তবে শাস্তির ধরণে পরিবর্তন, নিঃসন্দেহে বিশেষ গবেষণার দাবি রাখে।

ধর্ষণের অপরাধ সংগঠনের সামাজিক প্রেক্ষাপট, মনস্তাত্ত্বিক কারণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের সর্বোত্তম উপায়গুলোকে সামনে রেখেই গবেষণার কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
আবেগ বা স্যোশাল ডিমান্ড থিওরিতে গা ভাসিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা ভিকটিমকে সুরক্ষা দেবার পরিবর্তে তার জীবনকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

 

লেখক: নাফিউৎ জামান তালুকদার

আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল)

এ বিভাগের অন্যান্য