করোনাকে ভুয়া প্রমাণে বেশি মিথ্যাচারই ট্রাম্পের

করোনা সম্পর্কে ভুয়া তথ্য, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর গুজবে সয়লাব ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। কিন্তু এর বেশির ভাগই করেছেন মাত্র একজন। আর তিনি হচ্ছেন বিশ্বের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। করোনাকে ভুয়া প্রমাণে তিনি ছিলেন একাই একশ’। করোনা নিয়ে এমন কোনো ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নেই যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছড়াননি। করোনা সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম এই গবেষণাটি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি। এএফপি।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, মহামারীকালে গত কয়েক মাসে সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছেন ট্রাম্প। এক্ষেত্রে তাকে ‘সিঙ্গেল লার্জেস্ট ড্রাইভার’ অভিহিত করা হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ মে পর্যন্ত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া অন্তত ৩ কোটি ৮০ লাখ প্রতিবেদন, নিবন্ধ ও প্রবন্ধ মূল্যায়ন করে এ রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে কর্নেল অ্যালায়ান্স ফর সায়েন্সের একটি গবেষণা দল। গবেষণার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ভারত, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো থেকে। গবেষকরা জানিয়েছেন, বিশাল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের পর করোনা সম্পর্কিত অন্তত ৫ লাখ ২২ হাজার ৪৭২টি ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশই ছড়িয়েছেন ট্রাম্প।

করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যে শুরু থেকেই নানারকম উদ্ভট ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা দাবি অনলাইনে নিয়মিত ছড়াচ্ছে। হাসপাতালের ফেসমাস্ক চুরি থেকে শুরু করে করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা এবং জীবাণু যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে এই ভাইরাস ব্যবহারের কথা- সব রকম দাবিই শোনা গেছে রাজনীতিবিদদের মুখে। শুরুতে করোনাভাইরাসকে তেমন পাত্তা দিতে চাননি ট্রাম্প। তবে পরে বলেন, এটা বিশ্বব্যাপী মহামারীতে পরিণত হয়েছে। যখন ফেসমাস্কের চাহিদা বেড়ে গেল, তখন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন নিউইয়র্কের হাসপাতাল থেকে বিপুলসংখ্যক সার্জিক্যাল মাস্ক চুরি হয়ে যাচ্ছে। কর্নেল অ্যালায়েন্স ফর সায়েন্সের পরিচালক ও গবেষণাটির প্রধান সারাহ ইভানেগা বলেন, ‘এটা সবচেয়ে বড় বিস্ময় যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছেন।’

ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীনের সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস। সংবাদমাধ্যমটির এডিটর ইন চিফ হু জিজিন বলেছেন, ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি কোভিড-১৯-কে খাটো করে দেখার মূল্য দিচ্ছেন। এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, ‘কোভিড-১৯-কে খাটো করে দেখার যে জুয়া খেলেছেন তার মূল্য দিচ্ছেন ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি। এই খবর প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্রে মহামারীর পরিস্থিতি গুরুতর।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তার দায়িত্ব সামলাবেন কে? ৭৪ বছর বয়স্ক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর ছাড়িয়ে গোটা মার্কিন মুলুকেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এই গুঞ্জন। হোয়াইট হাউসের চিকিৎসকরা অবশ্য জানিয়েছেন, ‘তিনি ভালো আছেন এবং কোয়ারেন্টিনে থেকেই দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন। ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্পও কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের লাইভ কভারেজে উল্লেখ করা হয়েছে: যুক্তরাষ্ট্রের অনুক্রম আইন অনুসারে, ট্রাম্প দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন। খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সংস্পর্শে এসেছেন পেন্সও। সোমবার হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে ট্রাম্প ও পেন্সকে একসঙ্গে দেখা গেছে। ফলে তিনিও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাইক পেন্সও যদি অসুস্থতার কারণে অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে মার্কিন সংবিধান অনুসারে দায়িত্ব বর্তাবে হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির কাছে। তবে মে মাসে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কালিয়েহ ম্যাকএনানি জানিয়েছেন, প্রশাসন পেলোসির দায়িত্বগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কোনো প্রস্তুতি নিচ্ছে না।

এদিকে ট্রাম্প করোনাভাইরাস জটিলতার উচ্চঝুঁকিতে আছেন বলে সতর্ক করে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, অনেক কারণ রয়েছে যেগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে করোনাভাইরাসের গুরুতর জটিলতায় ফেলেছে। চিকিৎসকদের মতে, বয়স এবং অতিরিক্ত ওজনের কারণে কোভিড-১৯ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ট্রাম্পের উচ্চতা ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ২৪৪ পাউন্ড যা তাকে বেশি ওজনের ব্যক্তির পর্যায়ে ফেলেছে। খবর গার্ডিয়ানের অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের চিকিৎসক ব্যারি ডিক্সন বলেছেন, ‘ট্রাম্পের যদি নিউমোনিয়া সংক্রমণ দেখা দেয়, তাহলে ঝুঁকি বেড়ে যাবে। করোনার সঙ্গে যাদের নিউমোনিয়া শুরু হয় তাদের মৃত্যুহার অনেক বেশি, বিশেষ করে ৬৫ ঊর্ধ্ব বয়সীদের ক্ষেত্রে এটি আরও প্রকট।’

ডিক্সন বলেন, যদি তার নিউমোনিয়া গুরুতর আকার ধারণ করে তাহলে মৃত্যুঝুঁকিও আছে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে আমরা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ যেসব কারণ চিহ্নিত করেছি সেগুলো হল : তার বয়স এবং অতিরিক্ত ওজন। এসবও করোনায় তার উচ্চঝুঁকির কারণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসির) পরিসংখ্যান বলছে ৬৫-৭৪ বছর বয়সী কোভিড রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে ১৮-২৯ বছরের কোভিড রোগীর চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।

৭০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রতি হাজার কোভিড রোগীর মধ্যে মৃতের সংখ্যা ১১৬ অর্থাৎ মৃত্যুহার ১১.৬ শতাংশ। এর সঙ্গে মোটা কিংবা যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি।

এ বিভাগের অন্যান্য