ছাতকে রকমেলন ফলের চাষ, আলোচনায় ৩ তরুণ

সুনামগঞ্জের ছাতকে বিদেশি ফল রকমেলন চাষ করে রীতিমত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন স্থানীয় ৩ তরুণ কৃষক। গ্রীষ্মকালীন সুস্বাদু এসব ফল দেখতে অনেকটা দেশীয় ফল বাঙ্গির মতো। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বাসিন্দাদের কাছে এ ফলটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলটি সাধারণত দুই ধরনের হয়। হলুদ রংয়ের খোসায় আবৃত যে ফল এর ভেতরের খাদ্য অংশটি অনেকটা আমাদের দেশের বাঙ্গীর মতো। অন্যটি খোসার অংশ খসখসে ও ভেতরে অংশে হালকা হলুদ এবং বাদামি বর্ণের।

রকমেলন হল মাস্কমেলন গোত্রের একটি উচ্চমূল্যের বিদেশি ফল। আরবে একে সাম্মাম বলে। ফলের উপরের ত্বক পাথর (রক) এর মত, তাই অস্ট্রেলিয়াতে রকমেলন নামে পরিচিত। উর্দুতে খরবুজ বা খরবুজা, আমেরিকাতে ক্যান্টালোপ, এশিয়াতে মেলন নামে পরিচিত। সুইট-মেলন বা মিষ্টি বাংগিও বলেন অনেকে।

পুষ্টিগুণে রকমেলন অনন্য। বিভিন্ন এন্টি-অক্সিডেন্ট সম্পন্ন এই ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ এবং সি যা উচ্চ রক্তচাপ, এসমা কমিয়ে দেয়। এতে উপস্থিত বেটা ক্যারোটিন, ক্যান্সার রোধ করে। এছাড়াও এটি খুব রসালো ফল, ৯০ শতাংশ পানি, যা হাইড্রেশন বজায় রাখে ও হজমে সহায়তা করে। চুল ও ত্বকের জন্যও এই ফল উপকারী। তবে ডায়াবেটিক ও কিডনি রোগীর ফল খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় এ ফলের চাষাবাদ ও আশানুরূপ ফলন ঘটিয়ে ইতোমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছেন ছাতক উপজেলার কালারুকা ইউনিয়নের কালারুকা গ্রামের সৌখিন চাষী প্রবাসী রিয়াজ উদ্দিন, চানপুর গ্রামের বুরহান উদ্দিন ও রাজাপুর গ্রামের এনাম। তারা তিনজনে এলাকার ৪ বিঘা জমিতে এবার পরীক্ষামূলকভাবে রকমেলন চাষ করেছেন। পরীক্ষামূলক হলেও প্রথমবারেই তারা বাম্পার ফলন ঘটিয়েছেন। রকমেলন চাষ করে তারা এলাকায় নতুন ফল হিসেবে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। এতে এলাকার কৃষকরা এসব ফল চাষে অনেকটা আগ্রহী হয়ে উঠছেন। আগামী এক সপ্তার মধ্যেই তারা সাম্মাম ও রকমেলন ফল বাজরজাত করতে পারবেন বলে তারা জানিয়েছেন।

রকমেলন চাষ করা কৃষকরা জানান, ২০ ফেব্রুয়ারি রকমেলন চাষ শুরু করেছিলেন তারা। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অবলম্বন ও নিয়মিত পরিচর্যা করায় ফলনও ভালো হয়েছে। দু-আড়াই মাসেই ফল পরিপক্ব হয়-যা বাজারজাত করা সম্ভব। কৃষক বুরহান উদ্দিন জানান, উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে তারা ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলক ভাবে এ ফল চাষাবাদ করা করেছেন। ভবিষ্যতে বৃহৎ আকারে বাণিজ্যিকভাবে এ ফল চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

এ ফল চাষাবাদে প্রতি বিঘা হিসেবে ৭০ হাজার টাকা করে ৪ বিঘা জমিতে প্রায় পৌনে ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি সাম্মাম ফলের খুচরা মূল্য ৬৫-৭০ টাকা। রকমেলনের জন্য মাটি থেকে অন্তত ৫ ফুট উচ্চতায় মাচা তৈরি করতে হয়। এ ফল চাষে সূর্য্যের আলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ফলটিও পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়েছে। ফলনও সন্তোষজনক বলে জানান বুরহান উদ্দিন।

কৃষক এনাম জানান, রকমেলন বাগান দেখতে সেনাবাহিনী, থানা পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও আশেপাশের লোকজনের প্রতিদিন সমাগম ঘটছে এখানে। রাজাপুর এলাকায় ৪ বিঘা জমিতে সাম্মাম ও রকমেলন ফল আমরা চাষ করে তারা বাম্পার ফলন পেয়েছেন। রিয়াজ উদ্দিন জানান, সাধারণ চাষাবাদের মতোই সাম্মাম ও রকমেলন চাষ করতে হয়। সময়মতো সামান্য সার ও কীটনাশক দিয়ে গাছের সঠিক পরিচর্যা করলেই ফলন ভালো হয়। একটি গাছে ১০-১৫টি পর্যন্ত ফল ধরে থাকে। ফল বড় হওয়া বা পরিপক্ব হওয়ার আগেই ছিঁড়ে যাতে না পড়ে সে জন্য থলের মতো নেটব্যাগ নিয়ে ঝুলিয়ে রাখতে হয়।

এ ব্যাপারে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, সাধারণ তরমুজের চেয়ে সাম্মানের স্বাদ অনেক ভালো, মিষ্টিও বেশি। মালচিং পদ্ধতিতে ইয়েলো কিং ও সাগর কিং এই দুটি জাতের ফল চাষ করা হয়েছে। সাধারণত ৬০ দিনেই এ ফসল বাজারজাত করা যায়। এ ফলে ক্যালসিয়াম, লৌহ, ভিটামিনযুক্ত একটি ফল। শতকরা ৯৫ ভাগ জলীয় অংশ থাকায় এটি মানব দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে এ ফল।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হাসেন খাঁন বলেন সাম্মাম চাষ এ অঞ্চলে এটাই প্রথম। সরকার নিরাপদ ফসল উৎপাদন (আইপিএম) সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা মাধ্যমে এটি শতভাগ নিরাপদ ফল হিসবে উচ্চ মূল্যের ফল চাষের একটি অংশ। কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী ফলন হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য