সিলেটে বাড়ছে উপসর্গবিহীন করোনা রোগী, বাড়ছে ঝুঁকিও

বুধবার সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক শিক্ষানবিস চিকিৎসকের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। তবে তার শরীরে কোনো লক্ষণই ছিলো না। গাজীপুর থেকে সিলেট আসার কারণে সতকর্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তার নমুনা পরীক্ষা করিয়েছিলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতেই করোনা পজেটিভ ধরা পড়ে।

কেবল ওই চিকিৎসক নন, সিলেটে এমন ঘটনা ঘটছে আরও। কোনাে উপসর্গ ছাড়াই অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায়। শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় শনাক্ত হওয়ার আগে তারা মিশছেন অনেকের সাথে। ফলে বাড়ছে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিও।

সিলেট বিভাগে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার একদিনে ১৬ জন শনাক্ত হন। সিলেটে গত ৫ এপ্রিল এক চিকিৎসকের মধ্যে এ ভাইরাসের উপস্থিতি মিলে। তখন তিনিই ছিলেন বিভাগের প্রথম রোগী। তখন তার মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হওয়া কিছু লক্ষণ বিদ্যমান ছিলো। সে সময় এ চিকিৎসক বেশ কিছুদিন জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভোগেন। পরে নমুনা পরীক্ষার পর তার শরীরে করোনার উপস্থিতি মেলে।

তবে আক্রান্ত হওয়া বেশিরভাগ রোগীর কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায়নি। ফলে গোপনেই বেড়ে চলেছে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। যা সিলেটকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সিলেটে একদিনে সর্বোচ্চ ১৬ জন রোগী শনাক্ত হন। এরআগে বুধবার (২২ এপ্রিল) ১৩ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন।
বুধবার সিলেটে জেলায় আক্রান্ত হওয় দুজনের মধ্যে একজন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিস (ইন্টার্ন) চিকিৎসক অন্য ব্যক্তি সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে কর্মরত স্টোর কিপার।

এই দুই জনে করোনায় আক্রান্ত হলেও তাদের মধ্যে কোন লক্ষ্মণ বা উপসর্গ দেখা যায়নি। যদিও সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে কর্মরত স্টোর কিপারের মধ্যে সামান্য গলা ব্যাথা ছিলো, কিন্তু অন্য কোন অন্য কোনো উপসর্গ তার মধ্যে উপস্থিত ছিলো না। এছাড়া একইদিন শনাক্ত হওয়া সেই চিকিৎসকের মধ্যে কোন উপসর্গই ছিলো না। তিনি করোনার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা গাজীপুর থেকে ফেরার কারণে তার নমুনা পরীক্ষা করে করানোর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

এ ব্যাপারে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন বা পরবর্তীতে শনাক্ত হবেন তাদের সকলের মধ্যে এর লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দেবে না। এ সমাজে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি করোনাভাইরাসটি বহন করছেন। যাদের মধ্যে কোনপ্রকার লক্ষণ-উপসর্গ নেই। এদের অনেকেই নিজের অজান্তে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাচ্ছেন ও ঘটাতে সক্ষম হচ্ছেন। কারণ তিনি নিজেই জানেন না যে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। যেহেতু তিনি জানেন না তাই তিনি গোপনে এর সংক্রমণ ঘটিয়ে যাচ্ছেন। যা আমাদের বৃহৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’

তিনি বলেন, ‘এ দেশের মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত না সামাজিক দূরত্বের ব্যাপারে অভ্যস্ত না হচ্ছে ততোক্ষণ পর্যন্ত আমরা কেউই নিরাপদ না। উল্টো বিপদ আরও ঘনীভূত হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ত্রাণ নিয়ে। ত্রাণ আনতে যেয়েও অনেকে অজান্তে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাচ্ছেন এবং অনেকে সংক্রমিত হচ্ছেন।’

এদিকে বুধবার (২২ এপ্রিল) মৌলভীবাজারে দুইজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। দুইজনই জেলার কুলাউয়া উপজেলার। তাদের মধ্যে একজন করোনার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঢাকা ফেরত কুলাউড়া থানার এক পুলিশ সদস্য ও অন্যজন উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের বাসিন্দা এক নারী। এই দু’জন করোনায় আক্রান্ত হলেও তাদের মধ্যেও করোনাভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দেয়নি।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুরুল হক জানান, ‘গতরাতে শনাক্ত হওয়া উপজেলার দু’জনের কারো মধ্যেই কোন লক্ষ্মণ বা উপসর্গ ছিলো না। যা আমদের জন্য অত্যন্ত চিন্তার একটি বিষয়। এটি এখন সামাজিক সংক্রমণে রূপ নিয়েছে। যা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগের। এখন আমরা সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।’

এখন থেকে কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা সন্দেহভাজন কাউকে না এনে তাদের অবস্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করবেন জানিয়ে এ চিকিৎসক বলেন, ‘উপজেলার সাধারণ রোগীদের নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করে ও উপজেলাবাসীকে নিরবিচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা সেবা দিতে আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি। কেননা উপসর্গবিহীন এ ভাইরাস কে বহন করছে তা আমাদের জানা নেই। তাই তাদের মাধ্যমে হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে অন্য স্বাস্থকর্মীসহ সাধারণ রোগীদের সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা দেয়াই এখন আমদের লক্ষ্য।’

এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগের সর্বোচ্চ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়েছেন হবিগঞ্জ জেলায়। এ জেলায় এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ জন। এসব রোগীদের অধিকাংশই সম্প্রতি করোনার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় এসেছেন। সর্বশেষ বুধবার রাতে সিলেট থেকে পাঠানো রিপোর্টে হবিগঞ্জ সদরের ২ নারীসহ ৫জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। নতুন করে শনাক্ত হওয়া এ সকল রোগীদের মধ্যেও লক্ষ্মণ বা উপসর্গ দেখা যায়নি।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গতরাতে ৫ জনসহ জেলায় আক্রান্ত হওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১৭ জনেরই কোন ধরনের কোন লক্ষণ বা উপসর্গ ছিলো। যেহেতু তাদের বেশির ভাগই করোনার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন তাই তাদের কোয়ারেন্টিনে রেখে নমুনা সংগ্রহ করে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। তবে মাধবপুরে আক্রান্ত এক নারীর শুধু হালকা কাশি ছিলো যার উপর ভর করে তাকে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে সন্দেহভাজনের তালিকায় ফেলা যায় না। তারপরও তার নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ পাওয়া যায়। যা আমদের জন্য অত্যন্ত চিন্তার ও উদ্বেগের বিষয়।’

হবিগঞ্জে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে হবিগঞ্জেই যাতে উন্নত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় সেটার ব্যবস্থা করছি।’

সিলেট বিভাগের আরেক জেলা সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় বুধবার একদিনে চারজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে শুধু একজনের মধ্যেই শুধু জ্বরের উপস্থিতি ছিলো। বাকিদের মধ্যে মধ্যে কোন উপসর্গ বা লক্ষ্মণ ছিলো না। তারা সম্প্রতি করোনার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় এসে কোয়ারেন্টিনে ছিলেন।

সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শামস উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের মধ্যে এর লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা না যাওয়াটা আমাদের জন্য একটি ঝুঁকির বার্তা বহন করছে। এখন আমাদের সকলকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। যা থেকে সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব।’

এ ব্যাপারে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক সুলতানা রাজিয়া বলেন, ‘আমরা যে মানুষকে ঘরে থাকতে বলছি, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলতে বলছি, তা সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর জন্যই। তাই সকলকে উচিত নিজেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলে অভ্যস্ত করা। ’

এছাড়া নতুন কোনো ওষুধ বা টিকা না আসা পর্যন্ত এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই চলতে হবে উল্লেখ করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন সুলতানা রাজিয়া।

এ বিভাগের অন্যান্য