করোনা প্রতিরোধঃ টেস্ট, টেস্ট, এবং টেস্ট ও সমন্বিত প্রচেস্টা

ড. মোঃ বাশির উদ্দিন

করোনাভাইরাস, সাম্প্রতিক সময়ে সারাবিশ্বের কাছে এখন এক আতঙ্কের নাম । চীনের উহান থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগ এখন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স এর একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী ইউরোপ (স্পেন, ইতালি, জার্মানী, ফ্রান্স ) এখন পেনডেমিক করোনার ইপি সেন্টার। যুক্তরাষ্ট্র ইতালি, স্পেন, এবং যুক্তরাজ্যে এখন মৃত্যুর মিছিল। ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সকল দেশে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ থেকে ১ লাখে পৌঁছাতে ৬৭ দিন সময় লেগেছে। দ্বিতীয় একলাখ আক্রান্ত হতে সময় লেগেছে ১১ দিন। কিন্তু তৃতীয় একলাখ আক্রান্ত হতে সময় লেগেছে মাত্র ৪ দিন। তার পর থেকেই হু হু করে বেড়ে চলেছে কোভিড-১৯ এর মিছিল। ১৯ এপ্রিল ২০২০ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ২৪ লক্ষ মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছে যার মধ্যে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার লোক ইতোমধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছে এবং ৫৪ হাজারের মত রোগী সংকট পূর্ণ অবস্থায় আছে, সুস্থ হয়েছেন ৬ লক্ষ ১৩ হাজারের মতো (Worldometer)। এই রোগের বিস্তার রোধে সামাজিক দুরত্ব বাস্তবায়নে হোম কোয়ারেন্টাইন, সাধারণ ছুটি, লকডাউন, কারফিউ সহ বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ।
পৃথিবীর প্রায় সব গুলো উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেখানে করোনা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে ব্যতিক্রম হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। বিশ্বের প্রায় সব গুলো দেশের কাছে দক্ষিণ কোরিয়া তাই করোনা নিয়ন্ত্রণে রোল মডেল হয়ে উঠছে। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে অধিক সংখ্যক জনগণকে দ্রুততর সময়ের মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি টেস্টের আওতায় নিয়ে আসা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা। দেশটি অতি অল্প সময়ের মধ্য ২,৭০,০০০ বেশী টেস্ট করেছে যা মিলিয়ন প্রতি ৫২০০ এর বেশী। দক্ষিণ কোরিয়াকে অনুসরন করে এগিয়ে গেছে জার্মানী। ইতিমধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ জনগণকে ভাইরাসের উপস্থিতি টেস্টের আওতায় নিয়ে এসেছে জার্মানী। কমতে শুরু করেছে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংখ্যাও। ৬ এপ্রিল ২০২০-এ ন্যাচার সাময়িকীতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী জনগণকে ভাইরাসের উপস্থিতি টেস্টের আওতায় নিয়ে আসা ও সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসাই রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে জার্মানীতে। দুটি দেশই সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীন নিজস্ব স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার পাশাপাশি, বেসরকারি সংস্থার নির্দিস্ট মানের গবেষণাগার ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব গুলোকে কাজে লাগিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও করোনা ভাইরাস বা COVID-19 এর বিস্তার রোধে সম্ভাব্য সর্বোচ্চসংখ্যক পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছে। আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CDC) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) করোনা ভাইরাস এর উপস্থিতি নিরূপণের জন্য রিয়েল-টাইম রিভার্স ট্রানস্ক্রিপশন পলিমারেজ চেইন রিয়েকশন (RT-PCR) পদ্ধতিকেই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য (Gold-standard) বলে মতামত দিয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন রিয়েল টাইম পিসিআর মেশিন এবং এ পদ্ধতি জানা বিপুল সংখ্যক অভিজ্ঞ জনবল । দেশে অনেক দক্ষ মলিকুলার বায়োলজিস্ট বা গবেষক রয়েছেন। সরকার চাইলেই আমাদের দেশের এই দুর্যোগময় মুহূর্তে এ বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিদেরকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব গুলোকে (প্রয়োজন মতে BSL2+ মানের তৈরী করে) কাজে লাগাতে পারে। উল্লেখ্য যে, ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ গুলোতে সর্ম্পূণ নতুনভাবে রিয়েল টাইম পিসিআর মেশিন ও সুবিধা সম্বলিত ল্যাব স্থাপন করে টেস্ট শুরু করেছে। সূত্রমতে IEDCR এর তথ্যানুযায়ী, ২০ এপ্রিল ২০২০ তারিখ পর্যন্ত মোট পরীক্ষাকৃত নমুনার সংখ্যা ২৬৬০৪, আক্রান্ত ২৯৪৮ এবং মৃত্যু ১০১ জন। যা দেশের এই দুর্যোগময় মুহূর্তে প্রয়োজনের তুলনায় খুব খুবই অপ্রতুল। তাছাড়া, উপসর্গ প্রকাশ না করেই অনেকে আক্রান্ত হতে পারে যাদের দ্বারা অন্যদের সংক্রমিত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ বিষয়ে করোনা নিয়ন্ত্রিত দেশ দক্ষিণ কোরিয়াকে মডেল হিসাবে নিতে পারে (যদিও কন্টাক্ট tracing বিষয়টা আমদের দেশে সময় স্বাপেক্ষ)। ইতিমধ্যে স্থাপিত ল্যাব গুলোর সুবিধা জনগন কিছুটা পেতে শুরু করেছে। টেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আক্রান্তদের সঠিক সংখ্যা পাওয়া যাবে। আর আক্রান্তদের আইসোলেশনে নিয়ে ব্যবস্থা নিলেই এই মুহুর্তে করোনা প্রতিরোধে দেশ অনেকটা সফল হবে বলে আশা করছি। তাই করোনা প্রতিরোধে টেস্ট, টেস্ট, এবং টেস্টের কোন বিকল্প নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলেই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কে ভাইরাস এর উপস্থিতি নিরূপণের কেন্দ্র হিসেবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। অনেক প্রণোদনার পাশাপাশি আমরা যদি আমাদের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে রিয়েল-টাইম রিভার্স ট্রানস্ক্রিপশন পলিমারেজ চেইন রিয়েকশন (RT-PCR) ল্যাব তৈরির মাধ্যমে পুরো দেশকে করোনা টেস্টের আওতায় নিয়ে আসা যায়। অবশ্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে থেকেই রিয়েল-টাইম রিভার্স ট্রানস্ক্রিপশন পলিমারেজ চেইন রিয়েকশন (RT-PCR) ল্যাব রয়েছে যারা কিনা সরকার থেকে নির্দেশ পেলে কাজ শুরু করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ইতিমধ্যে সরকার চারটি বিশ্ববিদ্যালয় কে করোনা টেস্টের অনুমতিও প্রদান করেছেন। সেই সাথে দেশের দক্ষ ডিজিস আউটব্রেক স্পেশালিস্ট/এপিডেমিওলজিস্ট, গবেষক, চিকিৎসক, সায়েন্টিস্টদের কে নিয়ে (One Health) টিম গঠন করে এইসব জীবাণু বা রোগের নিয়ন্ত্রন, প্রতিরোধ, প্রতিষেধক ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিস্কারেরও ক্ষেত্র তৈরি করা যায়।

এখনো আমাদের হাতে সময় আছে। বাঁচার উপায় আছে। আসুন ‘করোনা যুদ্ধে’ জয় লাভের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জারি করা নির্দেশনা মেনে চলি। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে করোনা টেস্টের কেন্দ্র করার মাধ্যমে অধিক সংখ্যক জনসাধারণ কে টেস্টের আওতায় নিয়ে আসি।

লেখক; – ড. মোঃ বাশির উদ্দিন, মেডিসিন বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য