সিলেট মহানগর আ’লীগের সভাপতি পদে আলোচনায় কামরান এবং আসাদ

মুহিত চৌধুরী: সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয় ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর। এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৫ সালে। কিন্তু পরবর্তীতে আর নতুন করে সম্মেলন বা কমিটি গঠন হয়নি। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিই এখন অবধি দায়িত্ব চালিয়ে যাচ্ছে।
আগামী ৫ জানুয়ারি সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সিলেটের আওয়ামী রাজনীতিতে বইছে উত্তাল হাওয়া। নেতাকর্মীরা এখন উজ্জীবিত। পদ-পদবী প্রত্যাশিদের চলছে দৌড়-ঝাপ। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ প্রত্যাশি হিসেবে ৪ জনে নাম শোনা যাচ্ছে।

এই ৪ জন হলেন, বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, আসাদ উদ্দিন আহমদ, এডভোকেট রাজ উদ্দিন ও ফয়জুল আনোয়ার আলাওর। অবশ্য এসব নেতাদের কেউই সরাসরি সভাপদি পদে আসার বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলছেন না।
বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এবং আসাদ উদ্দিন আহমদের সাফ কথা ‘নেত্রী যে দায়িত্ব দেবেন, সে দায়িত্বই তারা পালন করবেন।
বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বর্তমান কমিটির সভাপতি এবং আসাদ উদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক। মহানগরে মূলত এই দুই নেতাকে নিয়েই সবচে বেশি আলোচনা চলছে। বাজারে একটা কথা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে এই প্রচারণার কোন ভিত্তি নেই।
মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ প্রত্যাশি হিসেবে ৪ জনের নাম শোনা গেলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন কামরান এবং আসাদ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা তাদের মতে সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে বাদ দিয়ে আসাদ উদ্দিন আহমদকে সভাপতি করার কোন সুযোগ নেই। কামরানকে যদি কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয় সে ক্ষেত্রে আসাদ সভাপতি হতে পারেন। আর যদি এটা সম্ভব না হয় তবে এই দুটি পদ যেভাবে আছে সেভাবে থেকে যেতে পারে।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান:
সর্বজন শ্রদ্ধেয় বর্ণাঢ্য রাজনীতি ও নির্বাচনী ক্যারিয়ারের অধিকারী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এর বয়স এখন প্রায় ৬৬ বছর। আর নির্বাচনী রাজনীতিতে তিনি জড়িয়ে আছেন প্রায় ৪৬ বছর ধরে। নির্বাচনের সাথে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সম্পর্ক কতোটা ঘনিষ্ঠ, এই একটি তথ্যই যেন বলে দিচ্ছে সব।

১৯৭৩ সালে ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচন দিয়ে শুরু রাজনৈতিক জীবন এরপর এখনও অবধি নির্বাচন ও রাজনীতিতে জড়িয়ে আছেন কামরান।

১৯৫৩ সালে জন্ম নেয়া বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ১৯৭৩ সালে ছিলেন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। ওই সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট শহরে তৎকালীন সময়ে ৫টি ওয়ার্ড ছিল,৩নং তোপখানা ওয়ার্ড থেকে নির্বাচনে কমিশনার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কামরান। ৬৪৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর ১৯৭৭ সালে আবারও ওয়ার্ড কমিশনার পদে নির্বাচন করে বিজয়ী হন কামরান।এই মেয়াদে দায়িত্ব পালন শেষে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমান কামরান। বেশ কিছুদিন পর দেশে ফিরে ১৯৮৯ সালে আবারও ওয়ার্ড কমিশনার পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হন তিনি।

১৯৯৫ সালে সিলেট পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।সিলেট পৌরসভা থেকে ২০০১ সালের ৯ এপ্রিল সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। ২০০৩ সালের ২০ মার্চ প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন। কামরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মেয়র পদে। ওই সময় নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নেয়ার সুযোগ না থাকায় ‘নাগরিক কমিটি’র ব্যানারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। বিএনপি নেতা এম এ হককে ২২ হাজার ৫৩১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৬ এপ্রিল গ্রেফতার হন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। এক মাস কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে ২৮ মে ফের গ্রেফতার হন তিনি।২০০৮ সালের ৪ আগস্ট সিসিকের দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কামরান তখন কারাগারে। সেবারও তিনি নাগরিক কমিটির ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। বিএনপি নেতা আ ফ ম কামালকে প্রায় ৮৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।

এই নির্বাচনে কামরানের ভোট সংখ্যা ছিল এক লাখ ১৫ হাজার ৪০৯। বিপরীতে কামাল পেয়েছিলেন মাত্র ৩২ হাজার ৯৭ ভোট। এছাড়া বিএনপি নেতা এম এ হক ২৩ হাজার ৪৮৭ ভোট।

সিসিকের তৃতীয় ও চতুর্থ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালে ও ২০১৮ সালে। নানা ষড়যন্ত্রের কারনে অল্প ভোটে পরাজিত হন। কিন্তু থেমে থাকেননি রাজনীতি ও ভোটের ময়দান থেকে।গত জাতীয় নির্বাচনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করতে।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ১৯৬৮ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। বিভিন্ন সময়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন কামরান। ২০০২ সাল থেকে এখন অবধি তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে আছেন। বর্তমানে তিনি দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য।আগামী ৫ই ডিসেম্বর সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন। সম্মেলনে এবারও বদর উদ্দিন আহমদ কামরান উনার প্রিয় মহানগরীর জন সাধারণের সাথে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে থাকার আগ্রহ রয়েছে, যদি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব দেন তাহলে তিনি তার শেষ বয়েসে দলকে অতীতের ন্যায় এগিয়ে নিয়ে শেখ হাসিনার ভিশন ও ডেলটা প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাবেন।

আসাদ উদ্দিন আহমদ:
সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে ওঠে আসেন তিনি। আসাদ উদ্দিন ১৯৭৮ সালে মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, পরের বছর ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সালে তিনি ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং ১৯৮২ সালে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি ছাত্রলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

আসাদ উদ্দিন আহমদ সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য মনোনীত হন ১৯৮৬ সালে। নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়ান তিনি। ১৯৯১ সালে হন জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। ২০০৩ সালে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১ম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে এখন অবধি মহানগরের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন আসাদ।

এ বিভাগের অন্যান্য