পরিকল্পনামন্ত্রীর এক ‘ধমকে’ই ব্যয় কমলো ১৭৩৯ কোটি টাকা!

নিউজ ডেস্ক: আদমশুমারি হিসেবে পরিচিত জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ব্যয় প্রস্তাব করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের কাছে ওই প্রস্তাব পাঠানো হলে ব্যয়ের ফিরিস্তি দেখে তাজ্জব বনে যান তিনি। প্রকল্প প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিবিএস কর্মকর্তাদের এক ধমক দিয়ে ব্যয় প্রস্তাব যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেন তিনি। ওই ধমকের পর নতুন করে প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবে সাড়ে ৩ হাজার কোটি থেকে ব্যয় ১ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা কমানো হয়েছে, নতুন ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১ হাজার ৭৬১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত, তা জানতে ১০ বছর পরপর আদমশুমারি বা জনশুমারি করে বিবিএস। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারিতে ব্যয় হয়েছিল ২৩৭ কোটি টাকা। আসছে ২০২১ সালে পরবর্তী শুমারি হবে। ওই শুমারির জন্য নেওয়া প্রকল্পে ২০১১ সালে ব্যয়ের তুলনায় ১৫ গুণ বাড়িয়ে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব দেয় বিবিএস।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ হয়েছিলাম। এরপর কীভাবে ব্যয় কমানো যায়, খোঁজখবর নিতে বলেছিলাম। এখন ব্যয় কমানো হয়েছে বলে শুনেছি।

১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকায় জনশুমারি করা গেলে শুরুতে কেন সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘আমিও সেটাই ভাবছি। কাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। ওই বৈঠকে এ ব্যয় আরও কমিয়ে আনা যায় কি না দেখব।’

বিবিএসের পাঠানো সংশোধিত প্রস্তাবনা অনুসারে, ২০২১ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৬১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে দেশীয় অর্থায়ন বা জিওবি থেকে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৭৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আর বৈদেশিক সহায়তার অংশ ধরা হয়েছে ১৮৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। জাতিসংঘের ইউএনএফপিএ, ইউএসএআইডি, ইউনিসেফ ও ডিএফআইডি অনুদান হিসাবে এই অর্থ দেবে।

মন্ত্রীর ধমকের পর সংশোধিত প্রস্তাবনায় বৈদেশিক সহায়তা অংশ অপরিবর্তিত রেখে দেশি অর্থায়নের অংশে ব্যয় কমানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এটা ‘দুর্নীতির নীল নকশা’র অংশ। মন্ত্রী বলার পর দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে, সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল কেন? যদি এই ব্যয় না কমানো হতো, তাহলে এই অতিরিক্ত টাকা লুটপাট হতো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা আরও বলেন, পরিকল্পনা কমিশন বেশ কয়েকটি খাতে আপত্তি জানিয়েছিল। ব্যয় কমানো নিয়ে বৈঠক হয়েছে একাধিকবার। এরপরও সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় কিছুটা বেশিই আছে বলে মনে করি।

প্রকল্প পরিচালক মো. জাহিদুল হক সরদার বলেন, সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তির কারণে ব্যয় কমাতে হয়েছে। তিনি বলেন, ১০ বছর পর জনশুমারি হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে ব্যয় বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়। এছাড়া এবারের শুমারিতে সুপারভাইজার ও গণনাকারীর সংখ্যা বেড়েছে, তাই ব্যয়ও বেড়েছে।

শুরুতে দ্বিগুণ প্রস্তাবের পর অর্ধেক টাকায় কীভাবে জনশুমারি করা হবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখন অর্ধেক বরাদ্দেই ম্যানেজ করতে হবে। কী আর করার।’

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, বিবিএসের প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) নিয়ে এরই মধ্যে দুটি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছে। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত প্রথম পিইসি সভায় প্রকল্পটির ব্যয় পর্যালোচনায় যুক্তিযুক্তকরণ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির পর্যালোচনার পর দ্বিতীয় পিইসি সভা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়। ব্যয় যৌক্তিকীকরণ কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক অংশে দ্বিগুণের বেশিও ব্যয় ধরা হয়েছিল। পরে কমিশনের আপত্তির মুখে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর বিষয়ে একমত হন বিবিএসের কর্মকর্তারা। এরপর যাচাই-বাছাই করে প্রকল্প ব্যয় অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসে।

বিবিএস জানায়, প্রস্তাবিত ২০২১ সালের আদমশুমারিতে ই-মেইল, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, টেলিফোন এবং পিক অ্যান্ড ড্রপ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এজন্য অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশন প্রশিক্ষণ ব্যয়ের বিষয়ে প্রশ্ন তোলে। নতুন প্রস্তাবনায় এ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। টেলিফোন, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট খাতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয় ১৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকার। সংশোধিত নতুন প্রস্তাবে তা কমিয়ে ১০ কোটি টাকা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন খাতে ৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। এখন এ ব্যয় নেমে এসেছে ২৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকায়। দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ খরচের জন্য ৪২ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকায়। এছাড়া ম্যাপিং খাতে ৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ১০ লাখ টাকায়। প্রকল্পের আপ্যায়নবাবদ ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩১ কোটি টাকা, নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে এটি ১৩১ কোটি টাকা কমিয়ে ধরা হয়েছে ৯৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। প্রকল্পের হারারিং চার্জ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, পরিকল্পনা কমিশন এ খাতের ব্যয় ২৩ কোটি টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার পরামর্শ দেয়। নতুন প্রস্তাবনায় এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এ হিসাবে এ খাতে ব্যয় কমেছে ৬১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এছাড়া প্রকল্পের জন্য গাড়ি, তেল, লুব্রিকেন্ট এবং গ্যাস-জ্বালানি খাত, আপ্যায়ন খাত, গাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমিয়ে আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রকল্পের অনেক খাতেই বাড়তি ব্যয় ধরা হয়েছিল। পরিকল্পনামন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে একাধিকবার পিইসি সভা করে এগুলো কমানো হয়েছে। নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা আগামী একনেক সভায় উপস্থাপন করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, দেশে প্রথম গৃহগণনা হয় ১৯৭৩ সালে আর আদমশুমারি হয় ১৯৭৪ সালে। ১৯৮১ সালে আদমশুমারি ও গৃহগণনা একসঙ্গে করা হয়। ২০১৩ সালে পরিসংখ্যান আইনের মাধ্যমে আদমশুমারিকে জনশুমারি করা হয়। এ শুমারির মাধ্যমে এটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের প্রতিটি খানা ও শতভাগ জনগণকে গণনার অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ২০২১ সালের মার্চ মাসে এই গণনা পরিচালনা করতে চায় বিবিএস। এখন প্রকল্প অনুমোদন হলেও তার আগপর্যন্ত নিজেদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে সংস্থাটি।আরিফুল হকের বিরুদ্ধে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিলে উত্তপ্ত সিলেট

নিউজ ডেস্ক: ‘প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে খুনি আরিফের ঠাঁই নাই’ ‘বিতর্কিত ব্যক্তিদের, বাদ দাও দিতে হবে’। এমন উত্তপ্ত শ্লোগানে মুখরিত সিলেট। রবীন্দ্র স্মরনোৎসব থেকে বিতর্কিত রবীন্দ্র সংস্কৃতি বিরোধীদের অপসারণ দাবিতে সোমবার (২৮ অক্টোবর) বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয় সিলেটের সংক্ষুব্ধ সংস্কৃতিসমাজ। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিকেল ৩টা বাজার সাথে সাথেই নগরীর রেজেস্ট্রারী মাঠ মিছিলে মিছিলে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে। সংক্ষুব্ধ সংস্কৃতি কর্মীদের এই দাবির প্রতি একাত্বতা প্রকাশ করে মিছিল পরবর্তী সমাবেশে যোগ দেয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট, জয় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, সুরমা সাহিত্য পরিষদ, ছড়ামঞ্চ, গীতিকবি ফাউন্ডেশনসহ একাধিক প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

মিছিল শেষে সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদমিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের যুগ্ম সম্পাদক বাদশাহ গাজীর সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সিনিয়র সহ-সভাপতি বাউল শিল্পী বিরহী কালা মিয়া।

সভায় বক্তব্য রাখেন, জয়বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি গীতিকবি হরিপদ চন্দ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রচার সম্পাদক শিল্পী এনএইচ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক শিল্পী ডিকে জয়ন্ত, সংস্কৃতি ও সংবাদকর্মী দেবব্রত রায় দিপন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এনামুল মুনির প্রমুখ।

সমাবেশ থেকে বক্তারা বলেন, সিলেটে স্মরণকালের একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক মহাযজ্ঞের আয়োজনে সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে যখন আনন্দ বিরাজ করছিলো, ঠিক সেই মুহুর্তে সিলেটের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে ভুল বুঝিয়ে একটি চক্র বিতর্কিত ব্যক্তিদের স্থান দিয়ে এই বৃহৎ আয়োজনে একটি কমিটি গঠন করে।

সেই কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বাদ দেয়ার দাবীতে সিলেটের সর্বস্তরের সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটে। অবশেষে বিক্ষোব্ধ সংস্কৃতিকর্মীদের আন্দোলনের মুখে জাসাস নেতা কতিথ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আমিনুল ইসলাম লিটন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য সাবেক মন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে কমিটিতে থাকা সুবিধাভোগী নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে হত্যা মামলার আসামী এবং রবীন্দ্রসংস্কৃতি বিরোধী আন্দোলনের অনুসারি বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।

এরই অংশ হিসেবে সিলেটের প্রতিনিধিত্বশীল সংস্কৃতিকর্মীদের পক্ষ থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। সমাবেশে বক্তারা, রবীন্দ্র স্মরনোৎসবে দলীয় ব্যক্তিদের আধিক্য নয়, রবীন্দ্র অনুরাগী সংস্কৃতি কর্মীদের যুক্ত করার জন্য পরিষদের আহবায়ক বরাবরে দাবি জানান। সমাবশে থেকে এই লক্ষ্যে স্মারকলিপিসহ আরো একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

এর আগে সংক্ষুব্ধ সংস্কৃতি কর্মীদের দাবির প্রতি একাত্বতা প্রকাশ করে বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন, সিলেট জেলা ও মহানগর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, তাঁতীলীগসহ ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপ ও উপগ্রুপের নেতৃবৃন্দ।

এ বিভাগের অন্যান্য