সংসার টানতে ৩দিন স্কুলে যাচ্ছে ৩দিন ব্যবসা করছে মনিকা

গোবিন্দ দেব: যে সময় স্কুলে থাকার কথা, সেই সময় করছেন বাজারে ব্যবসা। এজন্য সপ্তাহের ৭ দিনকেও ভাগ করেছেন দুই ভাগে। তিনদিন স্কুল যান আর তিনদিন ব্যবসা করেন। এখানেই শেষ নয়, যে তিনদিন স্কুলে যান সেই তিনদিনও বিকেলে থেকে রাত পর্যন্ত বসে পড়েন দোকানে।

বলছিলাম সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর এলাকার ইকড়ছই হলি চাইল্ড নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনিকার কথা। পরিবারের আর্থিক অনটন, শিক্ষার খরচ ও বাবার দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সার সব মিলিয়ে তাকে এ ব্যবসায় হাল ধরতে বাধ্য করেছে।

তবে এতে মনিকার আক্ষেপ নেই বরং আছে তৃপ্তি। প্রথমে লজ্জা লাগলেও এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এছাড়া প্রতিবেশী ব্যবসায়ীরা তাকে সহযোগিতা করায় ব্যবসা চালাতে তার তেমন সমস্যা হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

সরেজমিনে জগন্নাথপুর বাজার ঘুরে দেখা যায়, জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের মোল্লারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা পিযুষ দে জগন্নাথপুর বাজারে দীর্ঘদিন ধরে পান সুপারির ব্যবসা করে আসছিলেন। এই ব্যবসা থেকেই ৫ মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে সাত সদস্যর পরিবারের ব্যয়ভার চালিয়ে আসছিলেন পিযুষ দে। তবে বাঁধ সাধে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এসময় হঠাৎ করে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ক্রমশ অসুস্থ হতে থাকেন তিনি। চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

পীযুষ দের স্ত্রী লাভলী দে বলেন, স্বামীর পান সুপারি ব্যবসায় মেয়েদের ভরণপোষণ লেখাপড়া উপজেলা সদরে বাসা ভাড়া দিয়ে ভালই কাটছিল সংসার। হঠাৎ করে স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো সংসার তছনছ হয়ে যায়।

তিনি জানান, বড় মেয়ে রীমা দে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পর জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়েছে । দ্বিতীয় মেয়ে সোমা দে ও তৃতীয় মেয়ে মীতা দে সৈয়দপুর আদর্শ কলেজে এবার একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। চতুর্থ মেয়ে মনিকা দে হলি চাইল্ড নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। পঞ্চম মেয়ে লাবনি দে ইকড়ছই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। রিমা ও সোমা টিউশনি ও বিউটি পার্লারে কাজ করে লেখা পড়ার খরচ এবং সংসার খরচ যোগাতে সাহায্য করছে। এসব আয়ে সংসারের খরচের পাশাপাশি অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা ব্যয়ও চলবে। সব মিলিয়ে অভাব-অনটনে দিন কাটছে আমাদের।

মনিকা দে জানায়, সপ্তাহের শনি, সোম, বৃহস্পতিবার সে বিদ্যালয় ছুটির পর বিকেল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পান সুপারি বিক্রি করে। রোববার ও বুধবার এবং মঙ্গলবার তাকে পুরো দিন দোকানে সময় দিতে হয়। তাই এই দিনগুলোতে তার স্কুলে যাওয়া হয় না।

বড় মেয়ে রিমা রানী জানান, আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার রোগে আক্রান্ত। তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমরা প্রচুর টাকা খরছ করেছি। বর্তমানেও তার চিকিৎসা চলছে। এ চিকিৎসার ব্যয়ভার, সংসার ও পড়ালেখার খরচের টাকা যোগার করা আমাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তবে আমরা সবাই পড়তে চাই। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন আমাদেরকে কিছুটা হলেও যেন সাহায্য করেন।

জগন্নাথপুর বাজার তদারক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহির উদ্দিন বলেন, আমরা মেয়েটির খেয়াল রাখি, যাতে কোন সমস্যা না হয়। মেয়েটি খুব ভদ্র ও বিনয়ী হওয়ায় সবাই তাকে সহযোগিতা করে।

হলি চাইল্ড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান বলেন, মনিকার বাবা অসুস্থ তাই তাকে বাবার ব্যবসা দেখতে হয়। বিষয়টি জানার পর আমরা তাকে সহযোগিতা করি। মেয়েটি পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী, আশা করি দারিদ্র ও শিক্ষার সংগ্রামে সে জয়ী হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য