সর্বশেষ
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ছাড়াই পাসের সিদ্ধান্ত রাজস্থানে         উত্তর প্রদেশে বজ্রপাতে নিহত ২৩         কানাইঘাটে গৃহবধূ গণধর্ষণের প্রধান অভিযুক্ত আটক         বিশ্বের প্রথম সোনায় মোড়ানো হোটেল ভিয়েতনামে         দিল্লিতে চালু হল বিশ্বের সবচেয়ে বড় করোনা হাসপাতাল         কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ে ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুযোগ         ‘ডিআইজি নয়, আমি আইজিপিকেও পরোয়া করি না’         এন্ড্রু কিশোরের অবস্থা সংকটাপন্ন         হবিগঞ্জে আরও ৪৫ জনের করোনা শনাক্ত         বৃহস্পতিবার সারা দেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কর্মবিরতি         ভুতুড়ে বিলের দায়ে ২৯০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা         ভার্চুয়াল আদালত সব সময়ের জন্য নয়: আইনমন্ত্রী         স্বাধীনতা দিবসে ট্রাম্পের বর্ণবাদী বক্তব্য ‘শ্বেতাঙ্গই সেরা’         জন্মদিনের পার্টি দিয়ে করোনায় মৃত ব্যবসায়ী, আতঙ্কে কাঁপছে হায়দরাবাদ         ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে করোনা আক্রান্তের রেকর্ড        

আমার বাবা : আলী আমজাদ চৌধুরী

শাহরিয়ার বিপ্লব :

আমি মৃত বা মরহুম লিখতে পারি
না।
তিনি অনুক্ষণে আমার হৃদয়ে আছেন।
যদিও ১৯৯০ সালে তাঁকে আমরা শারিরীকভাবে হারিয়েছি।

একজন স্বাপ্নিক দ্রোহী মানুষ ছিলেন। আধুনিক রুচিশীল ও ফ্যাশনিস্ট হিসাবেই তাঁকে আমৃত্যু দেখেছি। খুবই বিলাসী আমোদে পরোপকারী লোক ছিলেন। নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। নিজের কাপড় চোপড় মানুষকে দিয়ে দিতেন। এমনকি আমাদের পারিবারিক জমাজমিও তিনি মানুষদের দিয়ে গেছেন।

পরিপাটি বিশুদ্ধ একজন মানুষ। আব্বার পোষাক পরিচ্ছেদ আর কথাবার্তায় অনেকেই মুগ্ধ হতেন। অনর্গল ইংলিশ, উর্দু এবং হিন্দিতে কথা বলতে পারতেন।
গান গাইতেন দরাজ গলায়। ফুটবলের নামকরা খেলোয়াড় ছিলেন। আমাদের চুল কেটে দিতেন। বোনদের মাথায় ফিতে বেঁধে দিতেন। পড়াতেন। স্কুলে ক্লাশ নিতেন।
কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না।

তাঁর বাবা মুন্সী নছিব উল্লাহ চৌধুরী ছিলেন আরো বিপ্লবী। বিদ্রোহী। বৃটিশ বিরোধী মনোভাব আর আন্দোলন থেকেই জমিদারদের বিরুদ্ধে বাস্তবিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বন্দুকযুদ্ধে জমিদারদের শুধু পরাজিতই করেন নি। আইনী যুদ্ধেও কলিকাতা হাইকোর্টে বিজয়ী হয়ে আমাদের অঞ্চলকে জমিদারদের শাসন থেকে মুক্ত করেছিলেন।

রক্তে বিদ্রোহের কনা ছিলো বলেই পাকিস্থানের শুরুতে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সুনামগঞ্জ কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছিলেন তৎকালীন শহুরে এলিটদের বিরুদ্ধে সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের একটি অঘোষিত জোট।

যে কারনে তৎকালীন মিনিস্টার মাহমুদ আলী সাহেবের সাথে আমার চাচা মরহুম আব্দুল খালেক চৌধুরীর( সেই সময়ের পঞ্চায়েত এবং চেয়ারম্যান) বন্ধুত্ব থাকার পরেও আব্বা বিপরীত রাজনীতিতে অর্থাৎ ছাত্রলীগের সাথে জড়িয়ে পড়েন।

আর যে কারনে পাকিস্তান রাজনীতির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানকে জানান দিতেই বি.এ পরীক্ষার রেজাল্ট হবার আগেই এমপি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সিনিয়র রাজনীতিবিদদের সাথে। তখন সাধারণ মানুষ এমপি হতে পারতেন না। সম্ভ্রান্ত এলিটরাই এমপি হতেন। এবং সংগত কারনেই একটি অসম রাজনৈতিক যুদ্ধে মাত্র এক ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন।
অবশ্য মৌলিক গনতন্ত্রের যুগ ছিল সেই সময়টা।

নির্বাচনে পরাজিত হলেও একই বছর বিএ পাশ করেন। সাথের বন্ধুরা নিরাপদ জীবনের জন্যে সরকারি চাকুরীতে চলে গেলেও তিনি থেকে গেলেন কন্টাকীর্ন রাজনীতির বন্ধুর পথে।

দেওয়ান ফরিদ গাজী তখন সিলেট অঞ্চলের আওয়ামী লীগের নেতা। তাঁর আহবানে ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামী লীগ সুনামগঞ্জ মহকুমা কমিটিতে ঢুকে পড়েন।

পরবর্তীতে জামালগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক, থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

৬৬ এর ছয় দফা আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের গ্রাম কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি গঠনের জন্যে এলাকায় থেকে যান।
তখন স্থানীয় চেয়ারম্যান গন আয়ুব খানকে বাধ্যতামূলক সমর্থন দিতে হতো। কিন্তু আব্বা চেয়ারম্যানশীপ যেতে পারে জেনেও আওয়ামী লীগের ৬৮ ৬৯ এর আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন।

৭০ এর নির্বাচনে নেতৃত্বের প্রতি চরম আনুগত্যে আর সরলতার কারনে জীবনের সুবর্ন সুযোগ হাতছাড়া করেন।

যদিও তৎকালীন সিলেট অঞ্চলের নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী আব্বাকে বলেছিলেন নির্বাচন করতে। কিন্ত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের প্রতি চরম আনুগত্য আর বিশ্বস্থতার প্রতিদান হিসাবে তিনি আমাদের সীট থেকে নমিনেশন চান নি।
সামাদ আজাদ তখন ন্যাপ থেকে আসার কারনে গাজীসাব সহ কেন্দ্রীয় এলিট নেতারা কেউই চাননি সামাদ আজাদ নির্বাচন করুক। তাঁরা অনেকেই চেয়েছিলেন আব্বা যেন সীট না ছাড়েন কারন আগের নির্বাচনে তিনি মাত্র এক ভোটে হেরেছিলেন।

কিন্তু আব্বা সামাদ সাহেবের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য দেখিয়েছিলেন।
মুলত সেদিনেই জাতীয় সংসদে যাবার স্বপ্ন চিরদিনের মতো বিলীন হয়ে যায় আব্বার জীবন থেকে।
৭০ এর নির্বাচনে আমাদের বাড়িতেই ছিল সামাদ সাহেবের নির্বাচনী অফিস।

গোলকপুর বাজারে বঙ্গবন্ধুর সভার পরে অনেকেই চাননি পাশাপাশি নতুন একটি বাজারে বঙ্গবন্ধু আসুক। কিন্তু আব্বার আগ্রহেই সেলিমগঞ্জ বাজারে বঙ্গবন্ধুর জনসভা হয়েছিলো। এবং সেই জনসভায় আব্বা সভাপতিত্ব করেছিলেন। আমার ফুফাতো ভাই খোকন চৌধুরী সেদিন বঙ্গবন্ধুকে মালা দিয়েছিলো।

সেই বছরই জুলাই মাসে আমার জন্ম হয়।

৭১ সালে জামালগঞ্জ থানা মুক্তি সংগ্রাম কমিটির সাত সদস্যের একজন সদস্য হয়ে তৎকালীন এমপি ও এমপিএ দের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পরে ৭৩ এর নির্বাচনে সংগত কারনেই রানিং এমপিদের জন্যে আব্বা আর কোথাও জায়গা পাননি।
অন্য কোনও সুযোগ সুবিধাও তিনি নিতে চান নি। অপরদিকে স্থানীয় পারিবারিক কোন্দলে তিনি তখন বিপর্যস্ত। তাই বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধুর আনুকূল্য নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ৭০ এর নির্বাচনের কথা মনে রেখে ৭৫ এর বাকশালের জামালগঞ্জ থানা গভর্নর হিসাবে আব্বাকে মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই ১৫ আগষ্ট ঘটে যায়।

এর পরের ইতিহাস আরো করুন।
আড়াই বছর আব্বা বাড়িতে আসতে পারেন নাই। যারা আব্বাকে ঠেলে বঙ্গবন্ধুর সরকারের সুযোগ নিয়েছিলো তারা সবাই জিয়ার সামরিক সরকারের সুবিধভোগী হয়ে যান।
আব্বা এবং আমাদের পরিবার আবারো নির্যাতনের শিকার হন। আমাদের বাড়ী ভাংচুর হয়। আর্মী পুলিশ প্রায়ই আমাদের বাড়িতে এসে হানা দিতো। আমার আম্মকেও একদিন মেরেছে। সেই দুঃসহ বেদনার স্মৃতি কাউকে বুঝানো যাবে না। আম্মার পিঠের হাড় এখনো বাঁকা রয়ে গেছে রেইফেলের বাটের বারি খেয়ে।
এর প্রতিবাদে ৭৭এ আমাদের কেন্দ্রে না বাক্স জিতে যায়। আবারও আর্মি এসে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়।

১৯৭৯ এর নির্বাচন। ৭৫ এর পরের আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়াবার ইতিহাস। কেউ তখন জয় বাংলা বলতে পারতো না। কারো বাড়ীতে বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকলে জেলে যেতে হতো। বই থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হতো।
সারাদেশের দেশপ্রেমিক আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা জেলে। বিদ্রোহী ছাত্রনেতারা ফাঁসিতে খুলছেন। বুক টান করে মৃত্যুকে আলীঙ্গন করতেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। আর্মি পুলিশের ছোঁড়া গুলি প্রেমিকার ঠোঁটের মতো চুমু খেয়ে ঢলে পড়তেন রাজপথে।

অনেক আওয়ামী লীগাররা তখন জিয়ার ১৯ দফা, জাগো দলে ভীড়ে গিয়েছিলেন।
কেউ কেউ সরাসরি না গিয়ে সামরিক শাসনের আনুকুল্য পেতে বিভিন্ন লীগ, বা কমিউনিস্ট পার্টিতে নাম লিখিয়েছিলেন।

সেই দুঃসময়ে ১৯৭৯ এর সংসদ নির্বাচনে আব্বাকে আবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী করা হয়। বিজয়ী হওয়া নয়। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামরিক শাসনের যাঁতাকল থেকে আওয়ামী লীগকে তুলে আনাই ছিলো সেই নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। যে কারনে স্থানীয় অনেক নেতাকে অনুরোধ করা হলেও কেউ প্রার্থী হতে চাননি।
কিন্তু আব্বা সেই দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের নৌকার মাঝি হয়েছিলেন। যদিও আব্বার আর্থিক অবস্থা তখন নিম্নগামী।

সামাদ আজাদ জেল থেকে বেরিয়েই সাচনা বাজারে এসেছিলেন আব্বার নির্বাচনী জনসভায়। এসে তিনি হতাশ হয়েছিলেন। সেই জনসভায় আমিও ছিলাম। জমির উদ্দিন চাচা, তেলিয়ার চৌধুরী, চানপুরের মান্নান মামা, লালপুরের ডা, রাজ্জাক চাচা, কামলাবাজের হামিদ চাচা, নয়াহলটের হান্নান ভাই, ভীমখালির মছব্বির ভাই, দুর্লভপুরের আফিন্দি চাচা, ঘাগটিয়ার মান্নান চাচারা, ডা,দেলোয়ার চাচারা ছিলেন।
জমিরউদ্দীন চাচা অবশ্য আমৃত্যু আব্বার পাশে ছিলেন।

সুনামগঞ্জ থেকে অনেক ছাত্রনেতারা এসেছিলেন। মারুফ ভাই, শাহি ভাই, পীর মতি ভাই, ফারুক ভাই, দিরাইয়ের সুজাত ভাইসহ অনেক মূখ এখনো আমার স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছেন।

এর পর ৮৬ সালে আবারও আব্বাকে সামাদ সাহেব খবর দিয়ে নিয়ে গেলেন ঢাকায়। সাথে আমিও ছিলাম৷ তিনি চেয়েছিলেন আব্বার আনুগত্যের ঋন শোধ করতে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় আব্বার নাম ছিলো। কিন্তু পরে জোটগত নির্বাচনের কারনে আব্বাকে আর প্রার্থী করা হলো না। কমিউনিস্ট পার্টির বরুন কমরেড (প্রসূন কান্তি রায়) কাকাকে এই সীট দেয়া হলো। আমি যখন চাকুরীতে যোগ দেই সামাদ সাব আমাকে এই বলে দোয়া করেছিলেন। তোর বাবার একটি ঋন আমি শোধ করলাম।

৯০ সালের ২০ মার্চ আব্বা মারা গেলেন। আব্বা এখন কেবলই স্মৃতি। কখনো ঝাপসা। কখনো অশ্রুভেজা।

এই জীবনে আব্বাকে আর পাবো না।
হাদীসে বলে, বাবা মা মারা গেলে, তাঁদের বয়সী মানুষ কে সম্মান করো। বাঁবা মায়ের জীবিত বন্ধু, সাথী, আত্নীয় স্বজনকে খেদমত করো। তাহলে সব খেদমত বাবা মায়ের কাছে পৌঁছে যাবে। তাদের জন্যে দোয়া করো। দোয়া পৌঁছে যাবে মৃত বাবা মায়ের আত্মায়।

আজ আমি যাঁদের ছবি দিলাম। তাঁরা প্রায় সবাই আমার আব্বার রাজনৈতিক জীবনের কোনও না কোনও স্বাক্ষী। সাথী।

তাঁদের জন্যে অন্তর থেকে দোয়া করছি। আব্বার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন আরো অনেকেই। এখনো আল্লাহ তাঁদের হায়াত দিয়ে রেখেছেন। সবার ছবি আমার কাছে নাই।

পরিচিত অপরিচিত সবার জন্যে আমি দোয়া করছি।
খাস দিলে দোয়া চাই তাঁদের সবার জন্যে।
আল্লাহ সবাইকে সুস্থ রাখুন। সবার নেক হায়াত দান করুন।

আজ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্টা বার্ষিকী।
আমার বাবার মতো লক্ষ লক্ষ অনুভূতির অপর নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *