সর্বশেষ
করোনা পরীক্ষায় ফি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত: টিআইবি         সুশান্তের পর আত্মহত্যা করলেন অভিনেতা সুশীল গৌডা         পদ্মায় নৌকাডুবির একদিন পর মিলল ২ কৃষকের লাশ, নিখোঁজ ২         শিশু সাহিত্যিক আলম তালুকদার আর নেই         একদিনে করোনায় সর্বোচ্চ আক্রান্তের রেকর্ড যুক্তরাষ্ট্রে         শেষ বিশেষ ফ্লাইটে ভারত থেকে ফিরলেন ১১২ বাংলাদেশি         ভার্চুয়াল ডিভিশন বেঞ্চ চালুর সিদ্ধান্ত         এবার রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখা সিলগালা         ফেভিপিরার ট্রায়ালে সুস্থ ৯৬% করোনা রোগী: বিকন         সিনিয়র সাংবাদিক রাশীদ উন নবী বাবু আর নেই         হিফজ মাদ্রাসা খোলার অনুমতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি         সিলেটে আরও ৩৪ জনের করোনা শনাক্ত         গোলাপগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত যুবকের মৃত্যু         পাপুল কুয়েতের নাগরিক হলে তার আসন খালি হবে: প্রধানমন্ত্রী         সুস্থের সংখা ৮০ হাজার ছাড়াল        

আমার সাইকেল জীবন!

পুলিন রায় :

প্রায় ২৭ বছর পর বাইসাইকেলে ওঠে মনে পড়ে যায় অনেক কিছু। একসময়(১৯৮৫-১৯৯০) সাইকেলের প্যাডেলেই ঘুরতো আমার জীবন। নয়/দশটা টিউশনি, অনার্সক্লাস এবং ছাত্র রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্য সাংগঠনিক কাজ সামাল দিতে এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। আমার ভাঙাচোরা সাইকেল দিয়ে ঘড়ির কাঁটা মেপে চলতো ছাত্রকালীন জীবন। ছাত্রকালিন বলতে অনার্স কাল। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে জীবনসংগ্রাম করার কারণেই একদিনও কলেজে না গিয়ে প্রাইভেটেই ইন্টার পাস করি। তাহলে একটু খুলে বলি সব।
১৯৭৯ সালে পরলোকগমন করেন আমার পিতা স্বনামধন্য শিক্ষক ললিত মোহন রায়। বাবা মারা যাওয়ায় মাথায় যেনো বাজ পড়ে। তখন আমি নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এক অবোধ বালক। কোন রকমে ১৯৮১ সালে পাশ করলাম এসএসসি। এ ক্ষেত্রে আমাদের একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী পরমাত্মীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা-শিক্ষক দুর্যোধন বিশ্বাসের পরামর্শ ও সহায়তা স্মরণ করছি শ্রদ্ধায়। বাবা পরলোকগমনের পর সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় আমাকেই ধরতে হয় সংসারের হাল। এ সময় আমার দশ/এগারো বছর বয়সের ছোট ভাই নির্মলকে পেয়েছি জীবন সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে। এসএসসি পাশের পর সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ গ্রামের বাড়িতে মা আর ছোট দুই ভাই ও এক বোন নিয়ে সংসারের হাল ধরতে আমাকে করতে হয়েছে জীবনের কঠোর সংগ্রাম। দুমুঠো ভাতের জন্য, বেঁচে থাকার তাগিদে তখন এসএসসি পাশ আমাকে মানুষের ক্ষেতে কাজ করা থেকে শুরু করে করতে হয়েছে পান সিগারেট, পলিথিনের ব্যাগ, ব্যাঙ ও মাছ ধরে বিক্রি করার কাজ। এরপর বড় বোনের দেওয়া দু’শ টাকায় ভর করে করেছি লাকড়ি এবং আটা ধান-চালের ব্যবসা। এই ব্যবসায় সাফল্য আসায় ছোট ছোট ভাইবোনকে স্কুলে ভর্তি করি।
১৯৮৫ সালের মাঝামাঝি আমি পল্লীগাঁ থেকে কাদামাটির শুঁদা গন্ধ গায়ে মেখে সিলেট শহরে আসি। গর্ভধারিণী জননী প্রফুল্ল বালা রায় তখন তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে নানাভাবে যুগিয়েছেন সামনে যাওয়ার প্রেরণা। এমতাবস্থায় তুখোড় জীবনসংগ্রামের একপর্যায়ে একদিনও কলেজে না গিয়ে ১৯৮৫ সালে সিলেট এম সি (তৎকালীন সরকারি কলেজ) কলেজ থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে পাশ করি এইচএসসি। এই আইএ পাসের পেছনে প্রিয় অগ্রজ শ্যামানন্দ সরকারের রয়েছে দারুণ এক ভূমিকা। সম্ভবত ১৯৮৩ তে আমার কাকার বিয়ে উপলক্ষে তাদের বাড়িতে গেলে পরিচয় হয় তাঁর সাথে। আমরা প্রায় সারা রাত গল্প করে কাটিয়ে দেই। এসএসসি পাস আমার জীবনকথা শুনে তিনি ইন্টার ক্লাসের বাংলা ও ইংরেজী মূল পাঠ্য বই এবং শ্রীকান্ত ও রক্তাক্ত প্রান্তর – এই চারটি বই পড়তে দিয়েছিলেন। তিনি তখন এমসি কলেজে বিএসসি-র শিক্ষার্থী। আমার জীবনসংগ্রামের ফাঁকে বই চারটি পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ করে ফেলি। প্রাইভেটে আইএ দেওয়ার পেছনে এটাও একটা প্রেরণা। এছাড়াও জীবন চলার পথে প্রিয় এই মানুষটির বিপুল উৎসাহ প্রাপ্তি বর্ণনাতীত।
যাহোক, বিএ -তে ভর্তি হতে আসি তৎকালীন সরকারি (বর্তমান এম সি) কলেজে। সনদ ও ছবি সত্যায়িত করতে গিয়ে দেখা হয় শ্রদ্ধেয়া শামসুন্নাহার ম্যাডামের সাথে। ম্যাডাম আমার এসএসসি ও এইচএসসি’র সনদ দেখে অনার্সে ভর্তি হতে বলেন। এই প্রথম ‘অনার্স’ নামের একটি শব্দ প্রবেশ করলো আমার কর্ণকুহরে। কেননা আমি এতোই গেঁয়ো ছিলাম যে, এইচএসসি পাশের পরও কোন ধারণা ছিলো না স্নাতক পাস বা অনার্স সম্পর্কে। আমার ধারণা ছিলো শুধু বিএ, বিএসসি বা বিকম সম্পর্কে। ম্যাডামের কথার কোন উত্তর না দিয়ে কেবল শুনে যাই তাঁর কথা। অনার্স সম্পর্কে আমার যে কোন ধারণা নেই সেটা জানতেন না তিনি। ভর দুপুরের এক অলস সময়ে তিনি আপনমনে অনার্স এবং পাসের ভালোমন্দ দুটো দিকই বলে গেলেন ক্ষণিককাল। এ ব্যাপারে আমার ধারণা হলো এই প্রথম। পরিশেষে ম্যাডামের সাথে ফ্রি হয়ে গেলে আমার জীবন সংগ্রাম ও প্রাইভেট এইচএসসি দেয়ার কথা একটু বলে ফেলি। ম্যাডাম সব শুনে জেদ ধরে বসলেন, ‘তোমাকে দিয়েই হবে। তোমাকে অনার্স পড়তেই হবে’। হায়রে নিয়তি বিএ পড়তে আসা সেই বোকাসোকা ‘গেয়ো’ আমি একদিন ভর্তি হয়ে যাই অনার্সে, ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এম সি) কলেজে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। শামসুন্নাহার ম্যাডামের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা থাকবে আমৃত্যু। তাঁর সাথে দেখা না হলে, কিংবা তিনি সঠিকভাবে নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ না করলে হয়তো পড়াই হতো না অনার্সে। ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে এসে ম্যাডামের শুভাশিস নিয়েছি পুনরায়। যা হোক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এম সি কলেজে চান্স পেয়ে গেলাম রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনার্সে। একসময় বিশিষ্ট সাহিত্যিক অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদ স্যারের পরম সান্নিধ্য পেয়ে চলে এলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। স্যার তখন এই বিভাগের চেয়ারম্যান। আমার জীবন চলার পথে সফিউদ্দিন স্যারের প্রেরণা ও নির্দেশনা কতোটুকু তা জানি কেবল আমি। বিনম্র শ্রদ্ধা স্যারের প্রতিও। বাংলা অনার্সে ভর্তি হওয়ার পরই ঘোরে যায় আমার জীবনের মোড়। বাদ দিয়ে দিতে হয় ব্যবসা। সিলেটে বসবাসের লক্ষ্যে ও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে শুরু করতে হয় টিউশনি। কিন্তু টিউশনি পাবো কোথায়। আমার সব জেনেশুনে নিজের টিউশনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে পায়ের নীচে মাটি এনে দিয়েছিলেন পরম আপন, অগ্রজ রাজনৈতিক বন্ধু মো. নিয়াজ উদ্দীন। তারপর জোগাড় করে নেই আরো কয়েকটি টিউশনি। সিলেট শহরে থাকা, পড়াশুনা করা, বাড়িতে ছোট ভাইবোনকে পড়ানোসহ সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়তে হবে তারও টাকা জমা করা- সব মাথায় নিয়ে নয়/দশটি টিউশনি চলতে লাগলো রুটিন মাফিক। সাথে কলেজের ক্লাস তো আছেই। পাশাপাশি তুমুলভাবে জড়িয়ে পড়ি বাম ছাত্র রাজনীতির সাথে। রাজনৈতিক বন্ধুদের সাহচর্যেই একদিন আমার প্রায় ১৯ বছর বয়সে প্রথম কোন লেখা ছাপা হয়ে যায় ‘দেশবার্তা’ পত্রিকায়। ক্রমান্বয়ে জড়িয়ে পড়ি সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মকাণ্ড, সম্পাদনা ও সাংবাদিকতার সাথে। লেখা ছাপা হতে স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা-সংকলন-সাময়িকীতে। ঘনিষ্টভাবে যুক্ত হয়ে যাই সম্পাদনা এবং উদীচীসহ নানা শিল্প-সাহিত্য সংগঠনের সাথে। সময় মাপা এ সব কিছু মোকাবেলা করতে সাইকেলই ছিলো এক অনন্য নির্ভরতা। যদিও বিগত প্রায় সাড়ে ২৫ বছর চালাচ্ছি মাটির সাইকেল। সে-ওতো দুই চাক্কার সাইকেলই। জানি না, আমার এই সাইকেল জীবন ভবিষ্যত সময়ের কোন্ বাঁকে গিয়ে যে শেষ হবে?
(অনেকে উপরের কথাগুলোকে গল্প-কেচ্ছা বলে ধারণা করতে পারেন। বলতে পারেন, এগুলো বলছি মানুষের দৃষ্টি লাভ করার জন্য। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এগুলোই আমার জীবনকথা।)






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *