সর্বশেষ
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ছাড়াই পাসের সিদ্ধান্ত রাজস্থানে         উত্তর প্রদেশে বজ্রপাতে নিহত ২৩         কানাইঘাটে গৃহবধূ গণধর্ষণের প্রধান অভিযুক্ত আটক         বিশ্বের প্রথম সোনায় মোড়ানো হোটেল ভিয়েতনামে         দিল্লিতে চালু হল বিশ্বের সবচেয়ে বড় করোনা হাসপাতাল         কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ে ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুযোগ         ‘ডিআইজি নয়, আমি আইজিপিকেও পরোয়া করি না’         এন্ড্রু কিশোরের অবস্থা সংকটাপন্ন         হবিগঞ্জে আরও ৪৫ জনের করোনা শনাক্ত         বৃহস্পতিবার সারা দেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কর্মবিরতি         ভুতুড়ে বিলের দায়ে ২৯০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা         ভার্চুয়াল আদালত সব সময়ের জন্য নয়: আইনমন্ত্রী         স্বাধীনতা দিবসে ট্রাম্পের বর্ণবাদী বক্তব্য ‘শ্বেতাঙ্গই সেরা’         জন্মদিনের পার্টি দিয়ে করোনায় মৃত ব্যবসায়ী, আতঙ্কে কাঁপছে হায়দরাবাদ         ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে করোনা আক্রান্তের রেকর্ড        

জেনে নেওয়া জরুরী, মৃত নারী-পুরুষের গোসলদান

কিভাবে দিবেন মৃত নারী-পুরুষের গোসলদান

শাহিদা বেগম : মানুষ মাত্রই মরণমীল। ছোট-বড়, ধনী-গরীব, সবাইকে মরতে হবে। দিনের পর যেমন রাত আসে এবং অন্ধকারের পর আলো আসে, তেমনি জীবনের পর মৃত্যু আসবেই। দুনিয়ার সকল সমস্যার সমাধান হয়তো সম্ভব কিন্তু মৃত্যু সমস্যার কোন সমাধান নেই। মৃত্যু শাশ্বত ও চিরন্তন সত্য। এটাকে প্রতিরোধ করা যায় না। এ কথাটিই আল্লাহ্্ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা পবিত্র কুরআনে একটি তত্ত্বের আকারে পেশ করছেন-“কুল্লু নাফ্্ছিন জাইক্বাতুল মাউত” অর্থাৎ “সকল প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।”
কিন্তু আমরা এই মৃত্যুকে ভূলে থাকতে চাই। তবুও মৃত্যু পিছু ছাড়ে না। যখন আমাদের কারো আপনজন মৃত্যুবরণ করেন তখন আমাদের অনেক করণীয় থাকে যা আমরা অনেকে বুঝি অনেকে বুঝিই না। যেমন মৃত্যুর সাথে সাথে তার চোখ বন্ধ করে দেয়া, তার হাত পা সোজা করে দেয়া, মাথার নীচ থেকে বালিশ সরিয়ে ফেলা। মৃত ব্যক্তি মহিলা হলে তার অলংকারিাদি খুলে ফেলা। কারণ শরীর শক্ত হয়ে গেলে খুলতে কষ্ট হবে। মুখটা কিবলামুখী করে দেয়া, পর্দা নিশ্চিত করা। এ সমস্ত কাজ নিকটজনেরা না করলে আর কে করবে। কিন্তু দেখা যায় নিকটজনেরা বিলাপেরত অথচ মৃত ব্যক্তির হক আদায় করার হুশ নাই। অনেকে আবার ভয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে যেতে চান না।

তারপর আসে মৃত ব্যক্তির গোসলের কথা। মৃত্যুর পর তার গোসল ও কাফন-দাফনে বিলম্ব করা উচিত নয়। নবী (সা:)-এর নির্দেশ হচ্ছে-“কাফন-দাপনে তাড়াতাড়ি করা। মৃত ব্যক্তি কারো বাড়ীতে অধিক্ষন পড়ে থাকা ঠিক নয় (আবু দাউদ)। মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়া ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তিকে যদি কিছু সংখ্যক মানুষ গোসল করিয়ে দেয় তখন এলাকার সকলেই দায়মুক্ত হলেন। যদি মৃতের গোসল না হয় তাহলে সকলেই গোনাহগার হবেন। আমাদের সমাজে এই ফরজটা বড়ই অবহেলিত। কেউ মারা গেলে যদি তিনি পুরুষ হন তখন মসজিদে খুঁজ করা হয়, ইমাম সাহেব কাউকে দিয়ে মৃতের গোসলের ব্যবস্থা করেন। আর যদি মৃত ব্যক্তি মহিলা হন তখন দেখা যায় আমরা কতটা অসহায়। এক শ্রেণীর মহিলাকে ডেকে আনা হয় যারা এসে এ কাজ করে টাকা পয়সা, শাড়ী, চাদর ইত্যাদি নিয়ে উদ্ধার করে দিয়ে যান। মৃতের পরিবার ভাবে টাকা দিলে সব হবে। এটা আর এমন কি কাজ। অথচ শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করার আগে ব্যক্তিটি কত আপন ছিল। নি:শ্বাস ত্যাগ করতেই সে ভয়ের বস্তুতে পরিণত হয়ে গেল।

আমাদের উচিত সকলেই মৃতের গোসল কিভাবে দিতে হবে, কিভাবে কাফন পরাতে হবে তা সঠিক ভাবে জানা। আমারও একদিন মৃত্যু আসবে, আমাকে গোসল দিবে বাইরের ভাড়া করা মানুষ, এটা নিশ্চয়ই আমি চাই না। তাছাড়া নিজের লোক যেভাবে আদর করে, ভালোবেসে গোসল করাবে, বাইরের মানুষ তা করবে না। অথচ আমাদের সমাজে মৃত্যুর পর মেয়ে মাকে ভয় পায়, মা মেয়েকে ভয় পায়। ভয় এ জন্যই বলছি তারা আগ্রহ নিয়ে গোসল দিতে চায় না, বলে সহ্য করতে পারবো না। আসল কথা হলো তারা ভয় পাচ্ছে। একদল যেভাবে ভয় পায় আরেক দল বেশী নির্বিক। মৃত ব্যক্তিকে এমনভাবে নাড়াচাড়া করে গোসল করায় যা মৃত ব্যক্তির কষ্টের কারণ হয়। আমরা জানি মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান রেখে তাকে আস্তে আস্তে গোসল ও কাফন পরানো উচিত।
গোসল করানোর সময় মনে রাখতে হবে আপনারা যারা গোসলে আছেন তাদের উপর অনেক বড় জিম্মাদারী। মৃত ব্যক্তিকে পাকসাফ করে শেষ গোসল আপনারা দিচ্ছেন। অতএব যেন কোন ত্রুটি না থাকে। তার জন্য মনকে নরম রেখে, আল্লাহর সাহায্য চেয়ে এই বড় কাজটা শুরু করুন। মুখে কালেমা শাহাদাত পড়তে থাকুন। চার পাঁচ জনের বেশী লোক না থাকাই ভালো। দুই তিনজন গোসল দিলেন, বাকীরা দেখে শিখলেন। যাতে আরো কেউ মারা গেলে লোক খুঁজতে বের হতে না হয়। নিজের কাজ নিজেরাই করে ফেলতে পারেন। আমি মহিলাদের কথাই বলছি। পর্দা নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যেন উকি ঝুকি দিয়ে না দেখতে পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। গোসলের খাটটা উঁচু হলে খুব সুবিধা হয়। আজ-কাল অনেকেরই কোমরে ব্যাথা, নীচু হয়ে গোসল করানো খুবই কষ্টের কাজ। প্রতিটা এলাকার মসজিদে ষ্টিলের মূর্দা গোসলের খাট থাকা উচিত। অথচ দুঃখের বিষয় কোন কোন এলাকায় ৩/৪ টা মসজিদ খুঁজেও এমন খাট পাওয়া যায় না। খুবই অল্প টাকা ব্যয়ে যে কোন ডুনার এমন একটা প্রয়োজনীয় জিনিস এলাকার মসজিদে রাখতেই পারেন। এর সওয়াব অনেক নি:সন্দেহে। মৃতের গোসলের জন্য যে সমস্ত কাঠের খাট ব্যবহার করা হয়, তা নীচু থাকে, পানি নিস্কাশনে সমস্যা হয়, আরো অনেক অসুবিধা হয়। মহিলা মৃত ব্যক্তিকে তার মাহরাম পুরুষ মানুষ খাটে এনে পৌঁছে দেবেন। ভারী বিছানার চাঁদর দুই তিনটা পুরাতন নরম কাপড়, তোলা, অল্প কুল পাতা দিয়ে গরম পানি, ঠান্ডা পানি, অল্প সাবান পানি, কর্পোর মেশানো পানি ইত্যাদি পূর্বাহ্নেই প্রস্তুত করে নিতে হবে।

এবার ধারাবাহিকভাবে গোসলের বর্ণনা করা যাক। প্রথমে মৃত ব্যক্তির গায়ের কাপড় খুলে ফেলতে হবে। তার জন্য মৃত ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়া যাবে না। কাপড় কেটে খুলে ফেলাই উত্তম। মনে রাখতে হবে কোন অবস্থাতেই মৃতের শরীরের দিকে তাকানো যাবে না। ভারী বিছানার চাঁদর দিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে নিয়ে কাজ করতে হবে। কাপড় খুলার পর দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিয়ে ইস্তিঞ্জা করাতে হবে। নরম কাপড় হাতে পেছিয়ে পানি ঢেলে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।

কাপড়ের উপর দিয়ে পানি ঢাললেই হবে। প্রয়োজনে কাপড়ের নিচে পানি ঢালতে পারেন। এ কাজটা মৃতের নিকটজন করলে ভালো। ইস্তেঞ্জা শেষ হলে ওযু করাতে হবে। প্রথমে মুখমন্ডল ধুতে হবে, তারপর কনুই পর্যন্ত দুই হাত, তার পর মাথা মাসেহ করে দুই পা ধুতে হবে। নাকে পানি বা কুলি করাতে হবে না। তবে তুলা ভিজিয়ে দাঁতের মাড়ি ও নাকের ভিতর মুছে দেয়া জায়েজ আছে। জানাবাত ও হায়েজ অবস্থায় মারা গেলে এরূপ করা আবশ্যক। এর পর নাক, মুখ ও কানে তুলা দিতে হবে যেন পানি ভিতরে না যায়। তারপর সাবান পানি চাঁদরের উপর ঢেলে দিতে হবে সারা শরীরে। মাথার চুলের বাঁধন খুলে সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। মৃতের শরীর ঘসতে হবে না অর্থাৎ ঢলে ঢলে গোসল করানোর কোন প্রয়োজন নাই। শর্ত হলো সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো। এবার সাবান মাখা চাঁদরের উপর আর একটা চাঁদর দিয়ে সাবান মাখা চাঁদরটা নীচের দিকে টেনে বের করে ফেলতে হবে। বিছানার চাঁদর ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে যাতে মৃতের শরীর কোন অবস্থাতেই অনাবৃত না হয়। এবার মৃত ব্যক্তিকে বাম কাতে শুইয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত তিনবার পানি ঢেলে ধুয়ে দিতে হবে। কাত অবস্থায় যেন শরীর অনাবৃত না হয় সেদিকে কঠোর যতœ নিতে হবে। এবার ডান কাতে শুইয়ে আবার তিনবার মাথা থেকে পা ধুয়ে দিতে হবে। এখন মৃত ব্যক্তিকে মাথা ধরে দুইজন হালকা উঁচু করে ধরবেন আর একজন পেট হালকা ভাবে চাপবেন। এবার শুইয়ে দিতে হবে। যদি কোন মল মূত্র বের হয় তা পরিষ্কার করে দিতে হবে। কিন্তু অযু এবং গোসলের দ্বিতীয়বার প্রয়োজন নেই। তারপর বাম কাতে শুইয়ে শরীরের ডান দিকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত কর্পোর মেশানো পানি তিনবার ঢেলে দিতে হবে। এখন আর একটা পাক বিছানার চাঁদর উপরে দিয়ে নীচেরটা সরিয়ে ফেলতে হবে। ঐ চাঁদর দিয়ে শরীরের পানি মোটামুটি শুকিয়ে নিয়ে, খাটটাকেও মুছে নিতে হবে।

এবার কাফন পরানোর পালা। কাফন মৃতের উপরে বিছিয়ে নেয়া যায়। মহিলাদের জন্য পাঁচ কাপড়-মাথাবন্ধ, কোর্তা, সিনাবন্ধ, ইজার, চাঁদর। প্রথমে চাঁদর, তারপর ইজার, তারপর সিনাবন্ধ, তারপর কোর্তা বিছিয়ে নিতে হবে। এবার বিছানো এই চার কাপড় লম্পালম্বি করে রোল করে নিয়ে লাশের নীচে অর্ধাঅর্ধী প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে।
প্রথমে কোর্তার কাটা অংশে মাথা ঢুকিয়ে দিতে হবে। এবার কোর্তা দিয়ে শরীর ঢেকে, মাথাবন্ধ পরিয়ে বিছানার চাঁদর সরিয়ে ফেলতে হবে। এখন সিনাবন্ধ বামপাশ আগে ডানপাশ পরে দিয়ে পরিয়ে নিতে হবে। একইভাবে ইজার ও চাঁদর পরিয়ে দিতে হবে। সব সময়ই কাপড়ের ডানপাশ অর্থাৎ মৃতের ডানপাশ উপরে থাকবে। পরিশেষে মাথার দিকে কাফন একত্রিত করে বেঁধে দিতে হবে। একইভাবে পায়ের দিকেও বাঁধতে হবে। পেটের দিকেও একটা ফিতা দিয়ে বেঁধে দিতে হবে যেন রাস্তায় বাতাসে খুলে না যায়। সবশেষে যা বলবো-এটা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এ কাজ কেউ কেউ ভয়ে করে না আবার কেউ এটাকে এমনই সহজ কাজ মনে করে যে কোন গুরুত্বই দেয় না।
বেশী প্রফেশনাল হতে গিয়ে দেখা যায় লাশকে একটা বস্তু মনে করা হয়। জরুরী বিষয় হতেই মৃতের সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো, বিশেষ করে বগল, চুলের গোড়া, আংগুলের ফাঁক, নখ ইত্যাদিতে পানি পৌঁছাতে হবে। তাই বলে বিশটা নখের জন্য বিশটা খিলাল ব্যবহার উচিত না। হাত দিয়ে আলতোভাবে পানি পৌঁছে দিলেই যথেষ্ট। লাশকে কষ্ট দেয়া যাবে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মৃতের গোসলদান শিক্ষা করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

(লেখক : সংগঠক, বহু গ্রন্থ প্রণেতা।)






Related News

  • জেনে নেওয়া জরুরী, মৃত নারী-পুরুষের গোসলদান
  • মেয়েরা যেভাবে আত্মশুদ্ধি করবে: থানভী রহ.
  • আবরার ফাহাদ হত্যা ও কিছু স্মৃতি বিস্মরণ
  • স্মৃতির ক্যাম্পাসে জামেয়া রেঙ্গা
  • চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি
  • এই গ্লানি এই সব দুঃস্বপ্ন কোথায় রাখি! কোথায় যাবো? কোথায় শান্তি? চন্দ্রশিলা ছন্দা
  • সিলেটের যানজটের কারণ ও নিরসনে করনীয়: ফাহাদ মোহাম্মদ
  • পবিত্র শবে মেরাজের সংক্ষিপ্ত পরিচিত- আহসান হাবীব শাহ
  • Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *