সোমবার, ০৪ মার্চ ২০১৯ ০৬:০৩ ঘণ্টা

চাকরিতে প্রবেশের বয়স নিয়ে যা ভাবছে সরকার

চাকরিতে প্রবেশের বয়স নিয়ে যা ভাবছে সরকার

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন চালিয়ে আসছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে চলছে তাদের আন্দোলন। বিভিন্ন সময় এ আন্দোলনে হামলাও হয়েছে। আন্দোলনের মুখে গেল বছরের শেষদিকে সরকার বয়স বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

চাকরিপ্রত্যাশী তরুণরা বয়স বাড়াতে নতুন সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে ফের মাঠে নেমেছেন। তবে সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যক্রম শুরু করেছে কিনা তা জানাতে পারেনি কর্মকর্তারা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণার সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা চাকরিতে বয়স বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার গঠনের পর বয়স বাড়ানোর বিষয়ে এখনো পদক্ষেপ নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

অবশ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়িয়ে হয়তো ৩২ করা হতে পারে। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে ৩২ থেকে বাড়িয়ে কত করা হবে, সে বিষয়ে তারা কিছু বলতে পারেননি।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালের আগে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭ বছর। ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে তা বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়।

এর পর ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সরকারি চাকরিতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়স দুই বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়। এর পর মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়স এক বছর বাড়িয়ে ৬০ বছর করে সরকার। সম্প্রতি ‘কর্মের হাত ৩০-এর শিকলে বাঁধা’ স্লোগান নিয়ে চাকরিতে বয়স বাড়াতে আবার মাঠে নেমেছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা।

তারা বলছেন, দেশে ১ কোটি ৫০ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকারের ৩ কোটি হাতকে বয়সের রশিতে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। বাঁধন খুলে দেন, হাতে কর্ম দেন, দেশ উন্নতির স্বর্ণশিখরে আহরণ করবে। বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫-এর বাস্তবায়ন চান তারা। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, সারাদেশের উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ২০১২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ঢাকাসহ সব জেলায় সরকারি চাকরির আবেদনের সময়সীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করার দাবিতে অহিংস, অরাজনৈতিক পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছে।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ স্পিকার থাকাকালীন অর্থাৎ ২০১২ সালের ৩১ মে নবম জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিসের ওপর আলোচনার সময় ৩৫-এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন। নবম জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে দশম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত ১০০ বারের বেশি বিষয়টি উত্থাপিত হয়। কিন্তু তা এখনো ঝুলে আছে। জানা গেছে, চাকরিতে বয়স বাড়াতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একাধিকবার সুপারিশ করে।

তবু সরকার এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করার দাবি তুলেছেন রাজনীতিকরাও। বিগত সংসদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, চাকরিপ্রত্যাশীদের দাবি যুক্তিযুক্ত। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। দশম সংসদেও বিষয়টি নিয়ে একাধিক সদস্য সিদ্ধান্ত প্রস্তাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

হাজী সেলিম বলেন, এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষেত্রবিশেষ চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০ বছর পর্যন্ত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৪০ বছর, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলংকায় ৪৫ বছর, ইতালিতে ৩৫ বছর, ফ্রান্সে ৪০ বছর, যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ বছর। আমাদের দেশে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়স ৩২ বছর ও নার্সদের ৩৩ বছর। অথচ সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীও চাকরিতে বয়স বাড়ানোর পক্ষে একাধিকবার জোর দাবি জানিয়েছেন।

তবু এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। চাকরিপ্রত্যাশী আন্দোলনকারীরা জানান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে চাকরিতে ঢোকার বয়স ৩৫ থেকে ৫৯ পর্যন্ত। ভারতেরও বিভিন্ন রাজ্যে চাকরির বয়সসীমা ৩৫ থেকে ৪৫। জানা যায়, পাকিস্তান আমলে চাকরি শুরুর বয়স ছিল ২৫ বছর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারি চাকরি করার জন্য দক্ষ লোক পাওয়া যাবে না বলে তা বাড়িয়ে ২৭ করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রইস উদ্দিন বলেন, বয়স বাড়ানোর বিষয়ে আমরা এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলে এ সংক্রান্ত ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠাতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। চাকরিতে প্রবেশে বয়স বাড়ানোটা যদি যৌক্তিক মনে হয়, তা হলে প্রধানমন্ত্রীই সিদ্ধান্ত নেবেন। যেহেতু বিভিন্ন জায়গায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেহেতু এটি নিয়ে চিন্তাভাবনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে সবকিছু নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। তিনিই মূল সিদ্ধান্তটা দেবেন।

সর্বশেষ সংবাদ

পাঠক

Flag Counter